সরকারি নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১০ জন। কর্মরত রয়েছেন আটজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী। বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হয় প্রায় তিন লাখ টাকা। অথচ বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র দুই শিক্ষার্থী।
এমন চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের তালতলা এলাকায় অবস্থিত বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
ঈদের ছুটির আগে টানা দুই দিন সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষগুলো প্রায় ফাঁকা। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা কয়েকজন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কেউ দেরিতে আসেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান। পাঠদানের পরিবর্তে অনেক সময় আড্ডা ও গল্পগুজবেই সময় কাটানো হয়। পরিদর্শনের দুই দিনের মধ্যে মাত্র এক দিন প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লোকনাথ বর্মণ বলেন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আশপাশের নুরানি মাদ্রাসার প্রভাব এবং অভিভাবকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁকের কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে।
তার দাবি, বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যার মধ্যে নিয়মিত উপস্থিত থাকে ছয়জন। তবে উপবৃত্তি সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ১২ থেকে ১৩ জনের কথা বলেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আটজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও চারটি শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া গত দুই বছর ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও নেই।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলুফা আক্তার জানায়, তাদের শ্রেণিতে মোট চারজন শিক্ষার্থী রয়েছে। সপ্তম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। একই শ্রেণির শিক্ষার্থী বাঁধন জানায়, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিরব জানায়, তার শ্রেণিতে সে এবং সাব্বির নামে আরেকজন শিক্ষার্থী ছাড়া আর কেউ নেই। সপ্তম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়টিও সে নিশ্চিত করে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু থেকেই শিক্ষার্থী সংকট ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।”
আরেক বাসিন্দা পারুল বেগম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় পরিদর্শন বা মনিটরিংয়ের সময় বাইরের শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো হয়।
স্থানীয় অভিভাবক মোস্তাফিজার রহমান জানান, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তিনি তার নাতিকে বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০, সপ্তম শ্রেণিতে ৪০ এবং অষ্টম শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর নাম নথিভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে মোট শিক্ষার্থী ১১০ জন। কিন্তু সরেজমিনে দুই দিনে মোট উপস্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র চারজন।
নথিভুক্ত শিক্ষার্থী ও বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে বড় এই ব্যবধান নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “আমি এখনো বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করিনি। খুব শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”