মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল তরুণদের সাহস, আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের এক অনন্য অধ্যায়। সেই সংগ্রামে যারা জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের অনেকেই আজ ইতিহাসের আড়ালে নীরবে জীবন কাটাচ্ছেন। তেমনই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক—যার আলোর স্পর্শে একসময় প্রাণ পেত রংপুরের নাট্য ও সাংস্কৃতিক মঞ্চ, অথচ তার নিজের জীবনমঞ্চ আজ অন্ধকারে ঢাকা।
১৯৭১ সালে আব্দুর রাজ্জাক তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। কৈলাশ রঞ্জন হাই স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি দেশের টালমাটাল পরিস্থিতি তাকে টেনে নেয় সংগ্রামের পথে। সমবয়সী ও বড় ভাইদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরিবার ও ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই তিনি পাড়ি জমান ভারতের পথে। গীতালদাহ হয়ে দিনহাটা, সেখান থেকে শিলিগুড়ি–দার্জিলিং অঞ্চলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়ে নেন এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ।
প্রশিক্ষণ শেষে হাতে পান এসএলআর রাইফেল। এরপর চিলাহাটি সীমান্ত, দেবীগঞ্জ, সৈয়দপুর ও ডোমার এলাকায় বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেন তিনি। একের পর এক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেখেছেন সহযোদ্ধার মৃত্যু, দেখেছেন হানাদার বাহিনীর পিছু হটা। ডিসেম্বরের শুরুতেই বিজয়ের আলোর দেখা পান এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন হলেও আব্দুর রাজ্জাকের জীবন সহজ হয়নি। ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করলেও দারিদ্র্যের কারণে আর পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংসারের হাল ধরতে কখনো রিকশা, কখনো ভ্যান, কখনো দিনমজুরের কাজ করেছেন। কিন্তু কখনোই মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে ভিক্ষার হাতিয়ার বানাননি।
রংপুর জেলা পরিষদের একজন ইলেকট্রিশিয়ানের কাছ থেকে আলোসজ্জার কাজ শেখেন আব্দুর রাজ্জাক। এরপর রংপুর টাউন হলকে কেন্দ্র করে নাটক, যাত্রাপালা, কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আলোসজ্জায় তিনি হয়ে ওঠেন অপরিহার্য নাম। তার আলোয় প্রাণ পেত শত শত নাট্য চরিত্র।
পরবর্তীতে তিনি রংপুর শিল্পকলা একাডেমিতে নৈশপ্রহরীর দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু সীমিত আয় ও সংসারের চাপ একসময় তাকে ভেঙে দেয়। ১৯৯৪ সালের দিকে অভিমান করে আলোসজ্জার কাজ ছেড়ে গ্রামে চলে যান তিনি। পরে আবার ফিরে এলেও জীবনের স্বচ্ছলতা আর ফেরেনি।
বর্তমানে বয়স ও দৃষ্টিশক্তি কমে আসায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন না আব্দুর রাজ্জাক। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে দিন কাটান। মুক্তিযোদ্ধা ভাতাই তার প্রধান অবলম্বন। থাকেন গঙ্গাচড়া উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ির একাংশে। তবুও সুযোগ পেলেই ছুটে যান টাউন হল চত্বরে। কাগজ–কলমে লেখেন নাটকের সংলাপ, শোনান মুক্তিযুদ্ধের গল্প। কথা বলতে বলতে কখনো স্মৃতি এলোমেলো হয়ে যায়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ আর মঞ্চের আলো নিয়ে আবেগ কখনো ফুরায় না।
রংপুরের সাংস্কৃতিক সংগঠক ও গবেষকরা মনে করেন, আব্দুর রাজ্জাক শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধাই নন, তিনি রংপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নীরব কারিগর। নাট্যব্যক্তিত্ব খন্দকার আব্দুল মজিদ হিরুর ভাষায়, “মুক্তিযুদ্ধে যেমন তার অবদান গর্বের, তেমনি নাটকপাড়ায় তার আলোসজ্জা ছিল অপরিহার্য।”
১৯৫২ সালের ১ অক্টোবর রংপুর শহরে জন্ম নেওয়া আব্দুর রাজ্জাকের মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নম্বর ৬৪। বিনয়ী, হাসিখুশি এই মানুষটি কখনো নিজের অবদান প্রচার করেননি। শত শত মঞ্চ আলোকিত করলেও আজ তার নিজের জীবনমঞ্চটাই আলোহীন। তবুও ইতিহাসের পাতায় তিনি রয়ে যাবেন—একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন নীরব আলোকশিল্পী, এক সত্যিকারের আলোর মানুষ হিসেবে।