ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কারাজ শহরে বিক্ষোভ চলাকালে গ্রেপ্তার হওয়া তরুণ বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর পরিবারকে জানানো হয়েছে। আগামী ১৪ জানুয়ারি এই দণ্ড কার্যকর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে, তা ১৯৮০–এর দশকের মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। তাঁর আশঙ্কা, বিচারবহির্ভূতভাবে এবং গণহারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুতর।
ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্র্যাসি ইন ইরান জানিয়েছে, এরফান সোলতানির একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল ইরানের জন্য স্বাধীনতার দাবি তোলা। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আইনজীবীর সহায়তা দেওয়া হয়নি। মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এরফান সোলতানির বিরুদ্ধে ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ইরানের আইনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। তবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকায় এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সহায়তার জন্য প্রস্তুত।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে সামরিক অভিযানের বিষয়টি বিবেচনায় রাখলেও কূটনীতিক সমাধানই এখনো তাদের অগ্রাধিকার। প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের রাস্তায় মানুষ নিহত হতে দেখতে চায় না—কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেটাই এখন ঘটছে।
তবে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। কংগ্রেসের একাধিক আইনপ্রণেতা মনে করেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো দেশে হামলা চালানো সংবিধানসম্মত নয়। তাঁদের আশঙ্কা, এতে উল্টো ইরানের বিক্ষোভকারীরা সরকারের পক্ষে একত্রিত হতে পারে।
এর জবাবে ইরানও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং পুরো অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
ইরানের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।