ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলে রংপুরে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতেগড়া জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি তছনছ করে জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের সবকটিতেই জয় পেয়েছে জামায়াত জোট। এর মধ্যে পাঁচটিতে সরাসরি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এবং একটি আসনে জোট-সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ফলাফল ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান।
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটির আংশিক) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মো. রায়হান সিরাজী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১,৪৭,২৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন পান ৬৯,১৩১ ভোট। এ আসনে মোট ভোটার ৩,৭৫,২২৭ জন। প্রদত্ত ভোট ২,২৮,৪৫৭; ভোটের হার ৬০.৮৯ শতাংশ।
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম ১,৩৫,৫৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী পান ৮০,৫৩৮ ভোট, জাতীয় পার্টির প্রার্থী পান ৩৩,৯৩০ ভোট। ভোটের হার ছিল ৬৮.৭৪ শতাংশ।
রংপুর-৩ (সদর ও সিটি) আসনে জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল ১,৭৮,০৬৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পান ৮৫,৪৯৮ ভোট। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের লাঙ্গল প্রতীকে পান ৪৩,৭৯০ ভোট এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকেন। ভোটের হার ৬৩.৯১ শতাংশ।
রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে জামায়াত-সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী আখতার হোসেন (শাপলা কলি) ১,৪৯,৯৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা পান ১,৪০,৫৬৪ ভোট। ভোটের হার ৬৬.৩৫ শতাংশ।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে জামায়াতের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী ১,৭৬,৪১১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী পান ১,১৫,১১৬ ভোট। ভোটের হার ৬৮.৩১ শতাংশ।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের মাওলানা নুরুল আমিন ১,২০,১২৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির সাইফুল ইসলাম পান ১,১৭,৭০৩ ভোট। ভোটের হার ৬৯.৫৫ শতাংশ।
রংপুর জেলার ছয়টি আসনে মোট ভোটার ছিলেন ২৫,৯৯,২০২ জন। ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের ৪,৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
রংপুর দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এবার ছয় আসনেই পরাজিত হয়ে আসনশূন্য হয়েছে দলটি। বিশেষ করে রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের তৃতীয় হওয়া রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভোটের দিন জি এম কাদেরকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। রংপুরের সেনপাড়ার বাসভবন থেকে তিনি বের হননি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার রংপুরের ভোটাররা লাঙ্গল প্রতীক থেকে মুখ ফিরিয়ে নতুন শক্তিকে সমর্থন দিয়েছেন। জামায়াতের প্রধান লড়াই হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। তবে উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে আবারও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে— এমন মন্তব্যও করেছেন অনেকে।
রংপুরের রাজনৈতিক মানচিত্রে এই ফলাফল বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।