নিঃসন্তান বড় ভাইয়ের কোল ভরাতে নিজের সন্তান ১২ বছরের জন্য তুলে দিয়েছিলেন এক দম্পতি। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও সন্তান ফেরত পাচ্ছেন না তারা। বরং জন্মনিবন্ধন পরিবর্তন করে শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী এ কে এম গানিউল জাদিদ এলজিইডিতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত একটি প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত। আর অভিযুক্ত তার বড় ভাই ডা. এ কে এম আসাদুজ্জামান, যিনি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান। অবসর নেওয়ার পর বর্তমানে তিনি রংপুর নগরীতে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাদিদের বাবা ওসমান গনির দুই সংসার। বড় সংসারের তিন ছেলের কারও সন্তান না থাকায় ছোট সংসারের ছেলে জাদিদের ছোট সন্তান আওসাফ আব্দুল্লাহকে নিঃসন্তান বড় ভাই আসাদুজ্জামানের কাছে ১২ বছরের জন্য লালনপালনের শর্তে দেওয়া হয়।
জাদিদের দাবি, ২০১০ সালে জন্ম নেওয়া ছেলেকে বাবা ও ভাই-ভাবীর অনুরোধে তাদের কাছে দেন। শর্ত ছিল—১২ বছর পর সন্তানকে ফেরত দেওয়া হবে।
জাদিদের অভিযোগ, ২০২২ সালে তার ভাই ও ভাবি শিশুটির জন্মনিবন্ধন নিজেদের নামে তৈরি করেন এবং তাকে নিজের সন্তান বলে দাবি করতে শুরু করেন। এরপর সন্তানকে ফেরত চাইতে গেলে তারা টালবাহানা শুরু করেন।
তার ভাষ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে হজে যাওয়ার আগে ভাই-ভাবি শিশুটিকে তার কাছে দিয়ে যান। পরে তিনি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তির প্রস্তুতি নেন। কিন্তু রংপুরের স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে জন্মনিবন্ধনে সন্তানের বাবা-মা হিসেবে ভাই আসাদুজ্জামান ও তার স্ত্রী শাম্মী আক্তারের নাম দেখতে পান।
পরে অভিযোগ ওঠে, রংপুর সিটি করপোরেশনে গিয়ে আবার নতুন জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয়, যেখানে বাবা-মা হিসেবে জাদিদ ও তার স্ত্রী ইলা শারমিনের নাম উল্লেখ করা হয়।
জাদিদের দাবি, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই ঢাকায় গিয়ে স্কুলের কাগজপত্র নেওয়ার কথা বলে তার ছেলে আওসাফকে রংপুরে নিয়ে যান আসাদুজ্জামান। পরে ফোনে জানিয়ে দেন—“বাচ্চাকে দিব না, পারলে যা করিস।”
এরপর সন্তানকে দেখতে রংপুরে গেলে তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন জাদিদ। এ ঘটনায় তিনি কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
পরে সন্তানের খোঁজ না পেয়ে গত বছরের ২৪ নভেম্বর ই-পারিবারিক আদালতে ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি।
রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বিভাগে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২১ আগস্টের এক জন্মসনদে শিশুটির বাবা-মা হিসেবে এ কে এম আসাদুজ্জামান ও শাম্মী আক্তারের নাম রয়েছে। আবার ২০২৫ সালের ১৪ জুলাইয়ের আরেকটি নিবন্ধনে বাবা-মা হিসেবে এ কে এম গানিউল জাদিদ ও ইলা শারমিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুটি সনদেই শিশুটির জন্মতারিখ একই।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিভাগের প্রধান নুর আলম সিদ্দিকী বলেন, মা-বাবার নাম ভিন্ন হলে দুটি সনদ আলাদা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে কোনো পক্ষ আবেদন করলে যাচাই করে সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া নেওয়া যাবে।
সন্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছেন জাদিদ দম্পতি।
জাদিদের স্ত্রী ইলা শারমিন বলেন, “ভাই-ভাবীর সন্তান নেই বলে শ্বশুরের অনুরোধে ১২ বছরের জন্য আমার কোল খালি করে সন্তান দিয়েছিলাম। এখন তারা আমার সন্তানকে দেখতে দিচ্ছে না, কথা বলতে দিচ্ছে না। আমি আমার সন্তানকে ফেরত চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় আসাদুজ্জামানের চেম্বারে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কল কেটে দেন এবং আর ফোন ধরেননি।
তার স্ত্রী শাম্মী আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। সংবাদ সুত্র: কালবেলা।