সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন কাঠামোর সব ভাতা কার্যকর হলে একজন সরকারি কর্মচারীর সর্বনিম্ন মাসিক বেতন হবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকায় একই গ্রেডের কর্মচারী পাবেন ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা। আর বিশেষ গ্রেডে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের গাড়িসুবিধা ছাড়া মাসিক বেতন-ভাতা দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা।
তবে নতুন বেতনকাঠামোর পুরো সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। বর্ধিত মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে। নতুন বাড়িভাড়াসহ অধিকাংশ ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করে। শনিবার সেটি প্রকাশ করা হয়। নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
নতুন বেতনকাঠামোতেও সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন বা ২০তম গ্রেডে মূল বেতন আগের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
এই গ্রেডে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হিসাবে বাড়িভাড়া হবে ৯ হাজার টাকা। এর সঙ্গে চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার, যাতায়াত ভাতা ৬০০, টিফিন ভাতা ৫০০ এবং মুঠোফোন ভাতা ১৫০ টাকা যোগ করলে মোট মাসিক বেতন দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এই গ্রেডে বাড়িভাড়া হবে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বা ১২ হাজার টাকা। ফলে অন্যান্য নির্ধারিত ভাতাসহ মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা।
নতুন কাঠামোয় নিয়মিত প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। জ্যেষ্ঠ সচিবদের মূল বেতন হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ঢাকায় ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া, ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ২ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা, ৫০০ টাকা মুঠোফোন ভাতা এবং ৩০০ টাকা ধোলাই ভাতা যোগ করলে মাসিক মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা।
এর বাইরে তাঁরা সার্বক্ষণিক গাড়িসহ আরও কিছু সরকারি সুবিধা পাবেন।
বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের নবম গ্রেডে মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। ভাতা যুক্ত হলে এই গ্রেডে সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ৬০ হাজার টাকার বেশি হবে।
নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও শুরু থেকেই শতভাগ বর্ধিত মূল বেতন পাওয়া যাবে না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ বর্তমান বেতনের সঙ্গে যোগ করে পাবেন।
২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত অংশের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ পাবেন।
২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বর্ধিত মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বর্ধিত মূল বেতন দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জুলাই থেকে প্রাপ্য বকেয়া অর্থ অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে দেওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন কাঠামোয় একই পদে আট বছর চাকরি করার পরও পদোন্নতি না হলে এবং চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক থাকলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এরপরও পদোন্নতি না হলে নির্ধারিত সময় পূরণের পর আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে একই পদের বিপরীতে একাধিক উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত প্রযোজ্য হবে।
পদোন্নতির সুযোগ নেই—এমন ব্লকড পদের কর্মচারীরাও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সব সরকারি কর্মচারীর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তারিখ হবে অর্থবছরের প্রথম দিন। একটি ইনক্রিমেন্ট ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তবে চাকরিতে যোগদানের ছয় মাস পূর্ণ না হলে ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যাবে না।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনও বাড়ছে। পাঁচটি স্তরে পেনশন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ফলে ৯ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তি পাবেন ১৮ হাজার টাকা।
৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি হবে। তবে সর্বোচ্চ পেনশন হবে ৭০ হাজার ২০০ টাকা।
নতুন বেতন আদেশে কর্মস্থল ও গ্রেড অনুযায়ী বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ, ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, পঞ্চম থেকে নবম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং প্রথম থেকে চতুর্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন।
ঢাকার বাইরে ১১টি সিটি করপোরেশন, সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকায় এই হার হবে গ্রেডভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। অন্যান্য এলাকায় বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে মূল বেতনের ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ।
নতুন কাঠামোর অধিকাংশ নতুন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীরা মাসে ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন। ৫০ বছর ১ দিন বয়স থেকে অবসর-উত্তর ছুটি শেষ হওয়া পর্যন্ত তা হবে ৪ হাজার টাকা।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকলে একজন সরকারি কর্মচারী সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য সন্তানপ্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা শিক্ষাসহায়ক ভাতা দেওয়া হবে।
চাকরিরত ও পেনশনভোগীরা বছরে দুটি উৎসব ভাতা পাবেন। বাংলা নববর্ষ ভাতা হবে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ।
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাসে ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা পাবেন। সিটি করপোরেশন এলাকায় একই গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পাবেন ৬০০ টাকা। পঞ্চম গ্রেড ও তার ওপরের কর্মকর্তাদের মুঠোফোন ভাতা ৫০০ এবং নিচের গ্রেডে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পার্বত্য জেলা এবং হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকায় কর্মরতদের জন্যও বিশেষ ভাতা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষায়িত হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কারাগার, ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর জন্য ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতার বিধান রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। এর অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অর্থায়ন কীভাবে হবে, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি। দেড়-দুই বছরে কি রাজস্ব আয় এত বাড়বে? ধরে নিলাম বাড়লই। এ টাকা তো সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতেই ব্যয় হয়ে যাবে। অন্য কাজেও যে অর্থ ব্যয় করতে হবে, তার কী হবে?’
তাঁর মতে, অর্থের সংস্থান করতে ঋণ নেওয়া কিংবা সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের মতো পথ বেছে নেওয়া হতে পারে। তবে বাজেট ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।