জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রাম তার নিত্যসঙ্গী। দুই বছর আগে বাবাকে হারিয়েছে। এরপর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান মা। বড় বোনের বিয়ের পর বিদ্যুৎহীন একটি জরাজীর্ণ ঘরে একাই দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। কখনো না খেয়ে, কখনো অর্ধাহারে থেকেও স্বপ্ন দেখা থামায়নি ১৩ বছর বয়সী সাঁওতাল কিশোরী স্মৃতি কিসকু।
সেই স্মৃতিই আজ জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গর্বিত করেছে পুরো রংপুর বিভাগকে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে চ্যাম্পিয়নের মর্যাদা অর্জন করেছে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের চককৃষ্ণ গ্রামের এই কিশোরী।
২০১৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া স্মৃতির জীবন ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। কিন্তু কিছুদিন আগে তিনিও নিখোঁজ হয়ে গেলে আরও কঠিন হয়ে ওঠে স্মৃতির জীবনযুদ্ধ।
তবে হতাশার কাছে হার না মেনে ফুটবলকেই বেছে নেয় সে। প্রতিদিন মাঠে গিয়ে অনুশীলন করেছে, নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে।
নতুন কুঁড়ির আসরে তার দুর্দান্ত নৈপুণ্য, গতি এবং বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা মুগ্ধ করেছে বিচারকদের। শেষ পর্যন্ত তার পারফরম্যান্সই রংপুর বিভাগকে এনে দেয় চ্যাম্পিয়নের গৌরব।
সম্প্রতি দীর্ঘ প্রায় দুই মাস পর মোবাইল ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায় স্মৃতি। মায়ের কণ্ঠ শুনেই আবেগে ভেঙে পড়ে সে। জীবনের দীর্ঘ অন্ধকারের মধ্যে এটি যেন এক টুকরো আশার আলো হয়ে আসে তার কাছে।
স্মৃতির কোচ মিলন মিয়া বলেন, “ওর মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও যে নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে একদিন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
স্থানীয়দের মতে, স্মৃতি কিসকুর মতো মেধাবী ও সংগ্রামী কিশোরীর জন্য নিরাপদ আবাসন, নিয়মিত শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার এবং উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা দেওয়ান হামদা বলেন, “অভাবকে জয় করে স্মৃতি যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা সবার জন্য অনুপ্রেরণা। যথাযথ সহায়তা পেলে সে আরও বড় সাফল্য অর্জন করবে।”
চোখে স্বপ্ন আর কণ্ঠে প্রত্যয়ের সুর নিয়ে স্মৃতি বলে, “আমি মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই। মা পাশে থাকলে আরও ভালো খেলতে পারব। আমার স্বপ্ন একদিন বাংলাদেশের হয়ে খেলব এবং দেশের জন্য গোল করব।”
রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, “স্মৃতি কিসকুর অর্জন পুরো দেশের জন্য গর্বের। তার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।”
সংগ্রাম, সাহস আর স্বপ্নের এই গল্প আজ শুধু একটি কিশোরীর সাফল্যের নয়; এটি প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।