টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোডো পাখির প্রাচীন ডিএনএর নমুনা সীমিত এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত নমুনার জিনগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে পাখিটির জিনোম বিশ্লেষণ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনে এআই ব্যবহার করছেন গবেষকেরা।
কোলোসো বায়োসায়েন্সেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন লাম বলেন, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জিনগত তথ্য বিশ্লেষণও বড় চ্যালেঞ্জ। এআইয়ের সাহায্যে জীবিত পাখির জিনের কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রক ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ডোডোর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত উপাদান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ডোডোর জিনোম বিশ্লেষণে এআই
গবেষকেরা সংরক্ষিত নমুনা থেকে ডোডো পাখির প্রায় সম্পূর্ণ জিনোম তৈরি করেছেন। এ কাজে বিলুপ্ত ডায়ার উলফের জিনোম বিশ্লেষণে ব্যবহৃত প্রযুক্তির কিছু অংশ কাজে লাগানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা ‘জিনোমর্ফ’ নামে একটি এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে মুরগি, কোয়েল, হাঁস ও পায়রার ভ্রূণে মুখমণ্ডলের বিকাশ নিয়ন্ত্রণকারী জিনগত উপাদান বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৭০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির জিনোম ও খুলির আকৃতি তুলনা করেছেন তাঁরা।
গবেষণায় প্রায় ২ হাজার ৩৫০টি সম্ভাব্য জিনগত নিয়ন্ত্রক উপাদান শনাক্ত হয়েছে, যা ডোডোর বিশেষ আকৃতির ঠোঁটের গঠন বুঝতে সহায়তা করতে পারে। তবে ঠোঁটের আকার, পুরুত্ব ও প্রস্থের মতো বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণে হাজার হাজার উপাদান ভূমিকা রাখতে পারে। কোন উপাদান কখন এবং কীভাবে জিনকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে, তা নির্ধারণ করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
যেভাবে ডোডোর বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা
ডোডো পাখির নিকটতম জীবিত আত্মীয় হিসেবে পরিচিত নিকোবর পায়রাকে এ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিকোবর পায়রার আদিম জননকোষ বা প্রাইমোর্ডিয়াল জার্ম সেলস সংগ্রহ করে সেগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে। এসব কোষ থেকেই পরবর্তী সময়ে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরি হয়।
গবেষকেরা ডোডোর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেই কোষগুলোকে প্রজননপ্রক্রিয়ায় কাজে লাগাতে চান। তবে এ পদ্ধতিতে ডোডোর মতো পাখি তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
প্রকল্পটির পাখি প্রজাতি বিভাগের পরিচালক আনা কিটে জানিয়েছেন, নিকোবর পায়রা নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে ডিম পাড়ে এবং সাধারণত একবারে দুটি ডিম দেয়। অন্যদিকে, মুরগির ডিম সহজলভ্য হওয়ায় গবেষণার জন্য তুলনামূলক বেশি নমুনা পাওয়া সম্ভব। এ কারণে বিকল্প প্রজনন-সহায়ক প্রজাতি হিসেবে মুরগি ব্যবহারের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে পাখির ভ্রূণ ডিমের মধ্যে বিকশিত হওয়ায় এ ধরনের গবেষণা জটিল। পরিবর্তিত জননকোষকে ভ্রূণের জননকোষে পৌঁছানো, সেগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করা বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ।
ডায়ার উলফ নিয়ে আগের গবেষণা
এর আগে কোলোসো বায়োসায়েন্সেস বিলুপ্ত ডায়ার উলফের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ধূসর নেকড়ের জিনোমে নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন এনে ডায়ার উলফের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগকে বিলুপ্ত প্রজাতির হুবহু পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। কোনো জীবিত প্রজাতির জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিলুপ্ত প্রাণীর নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য তৈরি করা আর সেই প্রজাতির সম্পূর্ণ জিনগত ও জীববৈজ্ঞানিক পরিচয় ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়।
কবে ফিরতে পারে ডোডো?
ডোডোর জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এবং সফল প্রজনন নিশ্চিত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। এ কারণে ২০৩০ সালের শুরুর দিককে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ওই সময়ের মধ্যে ডোডো পাখির জন্ম হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ডোডো একসময় ভারত মহাসাগরের মরিশাস দ্বীপে বাস করত। মানুষের আগমন, শিকার এবং মানুষের সঙ্গে আসা অন্যান্য প্রাণীর কারণে পাখিটির আবাসস্থল ও প্রজননব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায় বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়।
একসময় সহজে শিকারযোগ্য প্রাণী হিসেবে পরিচিত ডোডো এখন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতীক। এর জিনগত বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনে গবেষকেরা সফল হলে তা বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ এবং সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে ডোডোর বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনই শেষ কথা নয়। উপযুক্ত আবাসস্থল, প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা এবং বাস্তুতন্ত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও জীববৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর।