এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেটের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ব্যবহৃত পিএইচপি (PHP) প্রযুক্তির কিছু গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এসব ত্রুটি খুঁজে বের করার পর বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্কতা জারি করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত সফটওয়্যার হালনাগাদ করার পাশাপাশি প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের গবেষকেরা উন্নত এআই টুল ব্যবহার করে এসব দুর্বলতা শনাক্ত করেন। ওপেনএআইয়ের প্রযুক্তিও এ অনুসন্ধানে ব্যবহৃত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ঘটনাটিকে এআইয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা, যা ওয়েবসাইট ও ওয়েবভিত্তিক বিভিন্ন সেবা পরিচালনায় কাজে লাগে। অনলাইন শপ, উইকিপিডিয়া ও ওয়ার্ডপ্রেসের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন অংশে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে আক্রমণকারীরা নির্দিষ্ট কিছু দুর্বল সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশ, নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কিংবা সংবেদনশীল তথ্য চুরির চেষ্টা করতে পারে। তবে সব পিএইচপি-নির্ভর ওয়েবসাইট সমানভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার সংস্করণ ও ব্যবস্থাপনার অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
গরিলা সাইবার সিকিউরিটির প্রধান নির্বাহী পল স্পেন বিবিসিকে বলেছেন, এআই এ ধরনের দুর্বলতা শনাক্ত ও কাজে লাগানোর প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করতে পারে। তার ধারণা, সম্ভাব্য ঝুঁকির আওতায় বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট থাকতে পারে।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা গবেষক জিল স্লের মতে, এ ধরনের ত্রুটি কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হলে তার গুরুতর পরিণতি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা সতর্কতার পর কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের সিস্টেম সুরক্ষিত করতে সাময়িকভাবে ওয়েবসাইট বা নির্দিষ্ট সেবা বন্ধ রেখেছে। উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি সংস্থা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের সরকার, এডিনবরা কাউন্সিল এবং স্কটল্যান্ডের কয়েকটি সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটও সাময়িকভাবে অফলাইনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ত্রুটিগুলোর প্রযুক্তিগত বিবরণ প্রকাশ্যে আসার পর সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা বাড়তে পারে। বিশেষ করে সীমিত সাইবার নিরাপত্তা সংস্থান থাকা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পিএইচপি ডেভেলপাররা নিরাপত্তা দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সমাধান প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীদের নিজস্ব সিস্টেমে ব্যবহৃত পিএইচপি সংস্করণ যাচাই করে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা আপডেট দ্রুত ইনস্টল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা ও যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা সংস্থা ঝুঁকি কমাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন করতে পারবে না, তাদের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সেবা বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিয়েছেন, আপডেট ইনস্টল করার পাশাপাশি সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশের চিহ্ন এবং সম্ভাব্য ক্ষতিকর পরিবর্তন পরীক্ষা করা উচিত। ব্যবহারকারীদেরও সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করতে এবং এ ঘটনা ঘিরে ছড়ানো ভুয়া বার্তা বা ফিশিং লিংক থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, সফটওয়্যারের জটিল কোড বিশ্লেষণ করে মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রমণকারীরাও দুর্বলতা কাজে লাগানোর সরঞ্জাম তৈরি করতে পারে।
ফলে সাইবার নিরাপত্তায় এআইয়ের ব্যবহার একদিকে প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত দুর্বলতা সংশোধনই এ ধরনের হুমকি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।