সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ কফি অনেকেরই নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘুমঘুম ভাব কাটানো থেকে কাজে মনোযোগ বাড়ানো, ব্যস্ত দিনের শুরুতে নিজেকে সতেজ রাখতে কফির জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে। আর দুধ, চিনি বা মিষ্টি সিরাপ ছাড়া ব্ল্যাক কফি তুলনামূলক কম ক্যালরির পানীয়।
কফিতে ক্যাফেইনের পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। পরিমিত কফি পানের সঙ্গে বেশ কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। তবে কফিকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ‘জাদুকরী পানীয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কফির অন্যতম প্রধান উপাদান ক্যাফেইন। এটি মস্তিষ্কে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে সাময়িকভাবে ঘুমঘুম ভাব কমাতে এবং সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে পারে। ফলে সকালে বা কাজের সময় অনেকেই কফি পান করে তুলনামূলক সতেজ অনুভব করেন।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে পারকিনসন্সসহ কিছু স্নায়বিক রোগের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে কফি এসব রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
শরীরচর্চার আগে ব্ল্যাক কফি পানের প্রচলন রয়েছে। ক্যাফেইন ক্লান্তির অনুভূতি কিছুটা কমিয়ে শারীরিক কর্মক্ষমতা ও সহনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
তবে কফি খেলেই শরীরের চর্বি দ্রুত গলে যাবে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালরি নিয়ন্ত্রণই গুরুত্বপূর্ণ।
কফির সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হওয়া ক্ষেত্রগুলোর একটি লিভার। নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে লিভার ফাইব্রোসিস, সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
তবে লিভারের কোনো রোগ থাকলে কফিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কিছু হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ক্যাফেইন কিছু মানুষের রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
কফি পান করার পর বুক ধড়ফড়, অস্বস্তি বা রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সমস্যা হলে পরিমাণ কমানো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত কফি পান এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের তুলনামূলক কম ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কফিতে থাকা ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ও পলিফেনলের মতো যৌগ এতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে কফিতে প্রচুর চিনি, সিরাপ বা ক্রিম যোগ করলে অতিরিক্ত ক্যালরি ও চিনি গ্রহণের কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কিছু গবেষণায় কফি পানের সঙ্গে লিভার ও এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব ফলাফল থেকে কফিকে ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসার উপায় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফিতে ক্যালরি খুবই কম। ক্যাফেইন বিপাকক্রিয়া সাময়িকভাবে বাড়াতে এবং ব্যায়ামের সময় কর্মক্ষমতায় সহায়তা করতে পারে।
তাই উচ্চ ক্যালরির মিষ্টি পানীয়ের পরিবর্তে ব্ল্যাক কফি বেছে নেওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শুধু কফি পান করে ওজন কমানো সম্ভব নয়।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন গ্রহণকে বহুল ব্যবহৃত একটি সীমা হিসেবে ধরা হয়। তবে এক কাপ কফিতে ঠিক কতটা ক্যাফেইন থাকবে, তা কফির ধরন, পরিমাণ এবং তৈরির পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
এ ছাড়া ক্যাফেইনের প্রতি মানুষের সহনশীলতাও একেক রকম। তাই সবার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক কাপ কফি পান করার পরামর্শ দেওয়া যায় না।
অতিরিক্ত কফি পান করলে অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে দিনের শেষ ভাগে কফি পান করলে অনেকের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।
গর্ভাবস্থা, হৃদ্স্পন্দনের সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ অথবা নিয়মিত কিছু ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সব মিলিয়ে চিনি ও অতিরিক্ত ক্রিম ছাড়া এক কাপ ব্ল্যাক কফি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। এটি সকালে সতেজতা ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে ভালো ঘুম, সুষম খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প হিসেবে কফিকে দেখার সুযোগ নেই।