আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা থেকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে নিতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করেছে সরকার। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ৫৯১ ডলার, জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংক ও রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি বিনিয়োগ, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও সুশাসনে পরিবর্তনের রূপরেখা দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।
জিইডির ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি’ প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। গত বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে ২ হাজার ৯৫৮ ডলার থাকা মাথাপিছু আয় পাঁচ বছরের মধ্যে ৪ হাজার ৫৯১ ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে চলতি অর্থবছরের সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধাপে ধাপে বাড়িয়ে পঞ্চম বছরে সাড়ে ৮ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এরপর রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা আনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনার শেষ দুই বছরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতকে সংস্কারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ ও দুর্বল সুশাসনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করে প্রথম বছরেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকগুলোর সুশাসন শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব আদায় বিভাগ আলাদা করা, একক ভ্যাট হার চালু, করছাড় কমানো এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে যোগাযোগ অবকাঠামোতেও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-লাকসাম-ফেনী কর্ডলাইন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বিদ্যুতায়ন এবং ঢাকা-পঞ্চগড় ও ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রেল সংযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল, কমিউটার রেল ও মনোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫৬০ জন তরুণকে স্টার্টআপ ফান্ড থেকে অর্থায়ন এবং ১ হাজার ২০০ নারী উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এত বড় লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের মতে, পরিকল্পনায় উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তবে কর্মসংস্থান, কর, ব্যাংক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ কর্মকৌশল প্রয়োজন।
তাঁর মতে, তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি, বিনিয়োগে মন্দা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না থাকলে সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।