এ কে এম সুমন, রংপুর। রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। পুলিশের দেওয়া বক্তব্য, আসামিদের গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি, ঘটনাস্থলের আলামত এবং তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশকান্তি নাগ লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, একই পরিবারের চারজনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সারাদেশের মানুষ স্তম্ভিত ও শোকাহত। এমন পরিস্থিতিতে তদন্ত নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় থাকলে তা দূর করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
লিখিত বক্তব্যে প্রশ্ন তোলা হয়, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য যদি ডাকাতি হয়ে থাকে, তাহলে গণপতি চক্রবর্তীর পাশের নির্মাণাধীন বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন কেন হয়েছিল। শুধু গামছা ও রশি দিয়ে চারজনকে হত্যা কীভাবে সম্ভব হলো এবং বাড়ির বিভিন্ন স্থানে থাকা রক্তের দাগের বিষয়ে ফরেনসিক তদন্তে কী পাওয়া গেছে, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।
এ ছাড়া হত্যার সময় পরিবারের সদস্যদের কান্না ও আর্তনাদ আশপাশের কেউ কেন শুনতে পেলেন না, চারটি মরদেহ পড়ে থাকার পরও কীভাবে বিষয়টি দীর্ঘ সময় গোপন থাকল, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় এবং হত্যার সময়ের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, এসব প্রশ্নও তুলে ধরা হয়।
বাড়ির সামনের মন্দিরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের পূর্বপরিচয় এবং ঘটনার আগে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দিকে গণপতি চক্রবর্তীর ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ১৫ লাখ টাকা বর্তমানে কোথায় রয়েছে, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে লুট হওয়া স্বর্ণালংকারের পরিমাণ এবং উদ্ধার হওয়া অলংকারের সঙ্গে তার মিল রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলা হয়।
আসামিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশের দাবি করা মোটরসাইকেলটির ভূমিকা, ঘটনার সময় ওই এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া আসামিদের গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও আদালতে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলে সংগঠনটি বলেছে, তদন্তে পুলিশের বক্তব্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন, আলামত ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো একটি স্বীকারোক্তি বা বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে তদন্তভার নিয়ে জানতে চাইলে নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশকান্তি নাগ বলেন, “হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরনের সংশয় ও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং পুলিশের বয়ানের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা রয়েছে। সে কারণেই আমরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।”
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোজাহার আলীসহ কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার, মশিউর রহমান, মাহফুজ হোসেন, বিথী দাস, নন্দিনী, বিজয় প্রসাদ, তপুসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নাগরিক কমিটির নেতারা বলেন, একই পরিবারের চারজন হত্যার মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে যাতে কোনো সংশয় না থাকে, সেজন্য তদন্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। প্রকৃত অপরাধী যেই হোক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।