রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ (প্রিয়ম) চক্রবর্তীকে হত্যার ঘটনায় প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
ঘটনার পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক ব্যাখ্যা সামনে এলেও তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে সেই বয়ানে পরিবর্তন এসেছে। ফলে চাঞ্চল্যকর এই চার হত্যাকাণ্ড ঘিরে জনমনে যেমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তেমনি জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্নও।
গত ২২ আগস্ট রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাসা থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ। সিঁড়িতে পড়ে ছিল স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামীর মরদেহ। আর ১২ বছরের শিশু প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয় শোবার ঘরের খাটের নিচ থেকে।
প্রাথমিকভাবে বাড়ির ভেতরে তছনছ অবস্থা, ভাঙা আলমারি এবং মূল্যবান সামগ্রী খোঁজার চিহ্ন দেখে ডাকাতির বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
ঘটনার পর মাছুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালতে জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, জবানবন্দির পুরো বিষয় প্রকাশ না করা হলেও হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে।
প্রথমদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অভিযুক্তরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়।
তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতেই অবস্থান করে, গোসল করে, খাবার খায় এবং আলামত নষ্টের চেষ্টাও করে। কিন্তু পরে তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসে।
তদন্তের অগ্রগতিতে পুলিশ জানায়, শুধু মাদক নয়, জমিজমা-সংক্রান্ত পুরোনো বিরোধও হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ দাসের পূর্বপুরুষদের জমি গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার কিনেছিল। সেই বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল কি না, তা তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, যদি হত্যাকাণ্ড তাৎক্ষণিক ক্ষোভের ফল হয়, তাহলে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি কেন পরে সামনে এলো?
তদন্তের নতুন এক পর্যায়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে গ্রেপ্তার দুই আসামির মধ্যে প্রায় ৮০ বার ফোনে যোগাযোগ হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এ তথ্য হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
যদি ঘটনাটি হঠাৎ উত্তেজনার বশে সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে এত ঘন ঘন যোগাযোগের ব্যাখ্যা কী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার মাহবুবুর রশীদ দায়িত্ব গ্রহণের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানিয়েছেন, আগের তদন্তে যে তথ্য পাওয়া গেছে, আপাতত সেখান থেকেই তদন্ত এগোবে। তবে নতুন কোনো ক্লু পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের আশ্বাস দিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ বেশ কিছু বিষয়ে জানতে চাচ্ছে সেইসাথে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকেও বেশ কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। উল্লেখ্যযোগ্য কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা হলো- এটি কি সম্পূর্ণ মাদকসংশ্লিষ্ট ঘটনা?, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ কতটা প্রভাব ফেলেছে?, হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল নাকি তাৎক্ষণিক?, ডাকাতির আলামতগুলো প্রকৃত নাকি বিভ্রান্ত করার কৌশল?, ফোনালাপের তথ্য তদন্তে কী নতুন দিক দেখাচ্ছে?, কোনো তৃতীয় পক্ষ জড়িত ছিল কি না?
গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের একজন পরিচিত শিক্ষক। তার পরিবারকে ঘিরে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো রংপুরকে নাড়া দিয়েছে। ঘটনার পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠন দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
দুই আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য, ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং সম্ভাব্য অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চূড়ান্ত উত্তর মিলবে তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এখন একটাই প্রত্যাশা, চারটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনার সব রহস্য উন্মোচিত হোক এবং দোষীরা দ্রুত আইনের মুখোমুখি হোক।