রংপুরের পীরগাছার বড় হায়াত খাঁ আউলিয়াপাড়ার ছোট্ট ঘরটিতে এখন সারাক্ষণই শোনা যায় তিন নবজাতকের কান্না। একসঙ্গে তিন কন্যাসন্তানের আগমনে যে ঘরটিতে আনন্দের জোয়ার ওঠার কথা, সেখানে হাসির পাশাপাশি এখন জায়গা করে নিয়েছে দুশ্চিন্তাও। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন বাবা-মা, কিন্তু সেই স্বপ্নের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব।
সুমাইয়া, সুরভী ও মাইশা—তিন বোন একসঙ্গে পৃথিবীর আলো দেখেছে। তাদের ঘিরে মা হাসি বেগমের যেমন আনন্দের শেষ নেই, তেমনি বাবা সৌর মিয়ার চোখেমুখে ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা। কারণ, তিন নবজাতকের সঙ্গে সংসারে রয়েছে পাঁচ বছর বয়সী আরেক কন্যাসন্তান জামিলা। চার মেয়েকে নিয়ে এখন নতুন করে জীবন সাজানোর অপেক্ষায় পরিবারটি। অথচ সেই জীবনের ন্যূনতম খরচ জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সৌর মিয়া একসময় পিকআপ ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন। এখন তিনি বেকার। নিয়মিত কোনো আয় নেই। ফলে সংসারের স্বাভাবিক খরচ চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে একসঙ্গে তিন সন্তানের জন্মের পর বেড়েছে ব্যয়ের চাপ। প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে দুধ, ডায়াপার, ওষুধ ও পোশাক। শিশুদের পাশাপাশি অসুস্থ হয়ে পড়া মায়ের চিকিৎসার খরচও যোগ হয়েছে সেই তালিকায়।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে হাসি বেগমের। অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশনে ভুগছেন তিনি। প্রয়োজন চিকিৎসা, ওষুধ এবং পুষ্টিকর খাবারের। কিন্তু অর্থের অভাবে নিজের প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে নিজের অসুস্থ শরীর, অন্যদিকে তিন নবজাতককে সামলানোর দায়িত্ব—সব মিলিয়ে চরম সংকটের মধ্যে দিন কাটছে তার।
হাসি বেগমের কণ্ঠে তাই আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে অসহায়ত্বের সুর।
তিনি বলেন, ‘সন্তান আল্লাহর নেয়ামত। একসঙ্গে তিন সন্তান পেয়ে আমরা আনন্দিত। কিন্তু আমাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ইনফেকশনের জন্য একসঙ্গে নিজের চিকিৎসা ও সন্তানদের দুধ, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের খরচ জোগাতে পারছি না।’
হাসি বেগমের প্রত্যাশা, সরকার এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ পরিবারটির পাশে দাঁড়াবেন। সহায়তা পেলে সন্তানদের প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করে তাদের ভালোভাবে বড় করতে চান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, সৌর মিয়ার পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। একসঙ্গে তিন সন্তান জন্ম নেওয়ায় তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। নবজাতকদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত দুধ, পুষ্টি, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দরকার। কিন্তু পরিবারের বর্তমান আয়-রোজগারের পরিস্থিতিতে এসব ব্যয় বহন করা কঠিন।
প্রতিবেশীদেরও একই আকুতি—অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো হোক। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান ও হৃদয়বান মানুষ এগিয়ে এলে চার কন্যাকে নিয়ে পরিবারটির অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কাটতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বলেন, ‘আমরা শিশুদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করব। যমজ তিন শিশুর জন্য আর্থিক ও চিকিৎসাসহায়তা এবং তাদের কিছু উপঢৌকন দেওয়া হবে।’
সৌর মিয়ার ঘরে তিন কন্যার আগমন—একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় আনন্দ হয়তো আর কিছু নেই। কিন্তু সেই আনন্দকে টিকিয়ে রাখতে এখন তার প্রয়োজন সামান্য স্বস্তি, সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ ও চিকিৎসা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো কিছু সহায়তা।
চার মেয়েকে ঘিরে এই পরিবারের স্বপ্ন খুব বড় নয়। সন্তানগুলো সুস্থ থাকুক, মায়ের চিকিৎসা হোক, আর বাবার হাতে আবার একটি কাজ ফিরুক—এই ছোট ছোট চাওয়াগুলোই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। খবর- আজকের পত্রিকা।