জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকারিভাবে নতুন বাসভাড়ার তালিকা কার্যকর হওয়ার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো বাসে সর্বনিম্ন ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো বাসে যাত্রী ওঠানোর সময়ই চালকের সহকারীরা জানিয়ে দিচ্ছেন—‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি।’
অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনকর্মীদের কোথাও কোথাও কথা-কাটাকাটিও হচ্ছে। নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকায় ঠিক কত টাকা দিতে হবে, তা নিয়েও যাত্রীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শনির আখড়া, আসাদগেট, ফার্মগেট ও বাংলামোটর এলাকার বিভিন্ন বাসে যাতায়াত এবং যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বেলা পৌনে ১১টার দিকে শনির আখড়া বাসস্ট্যান্ডে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, ভুলতা ও মাতুয়াইল থেকে আসা অন্তত সাতটি বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাসগুলো গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করে।
এসব বাসের চালকেরা জানান, আগে বাসগুলো ডিজেলচালিত থাকলেও জ্বালানির দাম বাড়ার পর বেশ কিছু বাস গ্যাসে রূপান্তর করা হয়েছে। তাই তাঁরা আগের ভাড়াই নিচ্ছেন।
তবে সাইনবোর্ড থেকে সাভার রুটে চলাচলকারী লাব্বাইক পরিবহনে সোমবার রাত থেকেই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বাসের সহকারী। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে।
সাইনবোর্ড থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটে চলাচলকারী অনাবিল পরিবহনেও একইভাবে ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ভুলতা-গুলিস্তান রুটের মেঘলা পরিবহনে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছিল।
বেলা ১১টার দিকে শনির আখড়ায় আসে চাষাড়া থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা রুটে চলাচলকারী মৌমিতা পরিবহনের একটি বাস। যাত্রী তোলার সময়ই বাসটির সহকারী সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি।’
বাসের ভেতরে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে এক যাত্রী এবং শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার বিষয় নিয়ে আরও দুই যাত্রীর সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগেই কেন অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন যাত্রীরা।
সাদ্দাম হোসেনের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকে যাত্রীদের বিষয়টি জানিয়ে প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। তবে সব যাত্রীর কাছ থেকে তাঁরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে পারছেন না।
এই বাসে শনির আখড়া থেকে চানখাঁরপুলের আগের ভাড়া ছিল ২০ টাকা, নেওয়া হচ্ছিল ২৫ টাকা। নীলক্ষেত পর্যন্ত ২৫ টাকার পরিবর্তে নেওয়া হচ্ছিল ৩০ টাকা।
আগে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসব গন্তব্যে ১০ টাকা নেওয়া হলেও মঙ্গলবার নেওয়া হচ্ছিল ১৫ টাকা।
একইভাবে আসাদগেট থেকে ফার্মগেট এবং ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত আগে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও মঙ্গলবার কোনো কোনো বাসে ১৫ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে।
মৌমিতা পরিবহনের একটি বাসে এলিফ্যান্ট রোড থেকে মিরপুর মাজার রোডে যাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী কে এম আল আমিন।
তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে অতিরিক্ত বাসভাড়া সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ভোগান্তি তৈরি করেছে। বাসা থেকে ২০ টাকা ভাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেও এখন তাঁকে ২৫ টাকা দিতে হচ্ছে।
ফার্মগেট থেকে গুলিস্তানগামী বিহঙ্গ পরিবহনের যাত্রী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। আমরা তো গোনা টাকায় চলি। বাড়তি কোনো টাকা নেই। যে টাকা পাই, সেটা দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। নতুন করে গাড়িভাড়া বৃদ্ধি হলে সেটা আমাদের জন্য জুলুম।’
তবে সরকারিভাবে নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি নন অনেক যাত্রী।
ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম রানা বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দিইনি, দেবও না। যতক্ষণ তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রেট নির্ধারণ করবে না, ততক্ষণ অতিরিক্ত ভাড়া দেব না।’
বেলা একটার দিকে ফার্মগেট এলাকায় বিভিন্ন বাসে ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কোনো বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল, আবার কোনো বাসে আগের ভাড়াই বহাল ছিল।
আবদুল্লাহপুর-ফুলবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী এয়ারপোর্ট-বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহনের চালকের সহকারী রুবেল হোসেন জানান, নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হলেও তাঁরা যাত্রীদের কাছে বাড়তি টাকা চাইছেন। তবে অনেক যাত্রী তা দিচ্ছেন না।
সাভার-মতিঝিল রুটের ওয়েলকাম পরিবহনের একটি বাসের সহকারী সজীব মিয়া জানান, সোমবার রাত থেকেই তাঁরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। তবে একই পরিবহনের আরেক বাসের সহকারী মতিন মিয়া জানান, নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের পরই তাঁরা বাড়তি ভাড়া নেবেন।
অন্যদিকে শিকড় ও বিকল্প পরিবহনের সহকারীরা জানান, তাঁরা এখনো আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। শনির আখড়া ও ফার্মগেট এলাকায় বিআরটিসির দুটি বাসেও আগের ভাড়া নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর গণপরিবহনের সেবার মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে। অনেক বাস-মিনিবাস পুরোনো ও জরাজীর্ণ। কোনো কোনো বাসে প্রয়োজনীয় লাইট, ইন্ডিকেটর কিংবা আয়নার ঘাটতি দেখা যায়। বাসের ভেতরেও যাত্রীদের গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ভাড়ার চাপ।
সরকারি নতুন ভাড়ার তালিকা কার্যকর হওয়ার আগেই কিছু পরিবহন নিজেদের মতো করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু করায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিয়মিত গণপরিবহন ব্যবহারকারী যাত্রীরা।