হত্যার শিকার ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার দুধের বাচ্চাকে কেন ভিকটিম ব্লেমিং করা হচ্ছে?’
মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা অপ্রতিমের মা–বাবার সঙ্গে দেখা করতে তাঁদের বাসায় গেলে নাহিদা বেগম এসব কথা বলেন।
ছেলেকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিভিন্ন প্রচারের প্রতিবাদ জানিয়ে নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার দুধের শিশু, তাকে ব্লেমিং করা আমি কোনো দিন মেনে নেব না। আমার দুধের বাচ্চা, আমার ছেলে বোঝে না। তাকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, দীর্ঘদিন সময় নিয়ে তাকে বন্ধু বানিয়ে, সবার কাছে ভিকটিম বানিয়ে দিয়ে বলছে, “দেখো, ও আমাদেরই একজন সদস্য, ও আমাদের সঙ্গে খেলছে, ওর কারণে ও মরে গেছে”—আমি কিন্তু সেটা মানব না।’
অপ্রতিমকে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে নানাভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদা বেগম।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের শুরুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অনেক মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার জেরে তাঁর ছেলেকে টার্গেট করা হয়ে থাকলে সেটিও তিনি মেনে নেবেন না বলে জানান।
তবে অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে তাঁর ওই সময়ের কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তিনি দেননি।
ছেলের হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি শুধু আমার ছেলের জন্য বিচার চাই না। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তারা জেল থেকে বের হলে আরও কত বাচ্চার জীবন নেবে, কত বাচ্চার জীবন ধ্বংস করবে—সেটা নিয়েও আমি চিন্তিত। আমি চাই, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক।’
মঙ্গলবার রাতে অপ্রতিমের মা–বাবার সঙ্গে দেখা করতে তাঁদের বাসায় যান কুমিল্লা আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কাইমুল হকসহ জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা।
বুধবার সকালে কাইমুল হক বলেন, অপ্রতিমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন।
তিনি জানান, একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অপ্রতিমের চলাফেরা নিয়ে নেতিবাচক তথ্য প্রচার করছে বলে তাঁদের জানিয়েছেন নাহিদা বেগম। সন্তান হারানোর শোকে পরিবারটি এমনিতেই বিপর্যস্ত। এর মধ্যে এ ধরনের প্রচার তাঁদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামিদের পক্ষে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আদালতে লড়বেন না বলে জানিয়েছেন সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ।
মঙ্গলবার বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের মতবিনিময় সভা শেষে তিনি এ নীতিগত অবস্থানের কথা জানান।
মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মৌখিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আইনজীবী সমিতির কেউ অপ্রতিম হত্যা মামলায় আসামিদের পক্ষে লড়বেন না।’
তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত সিদ্ধান্ত নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার নির্মমতা বিবেচনায় মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে আইনজীবীদের মধ্যে এমন অবস্থান তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে আসামিদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি। তিনি জানান, প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে আসামিদের জন্য আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে। কারণ, একতরফা বিচার হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম, সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ, পিপি কাইমুল হক ও জিপি তারেক আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জেলা আইনজীবী সমিতির অন্যান্য নেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা সভায় অংশ নেন।