মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কৌশলগত অংশীদারত্বে কর্মীদের কল্যাণে নতুন উদ্যোগ আকিজ রিসোর্সের তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার সমাজকল্যাণমন্ত্রী শক্তি বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের, বুধবার অন্ধ্র উপকূলে আঘাতের শঙ্কা পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবকের বাড়িসহ তিন বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ২ অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি ২৯ অক্টোবর হচ্ছে না এইচএসসির ফল, নতুন তারিখ ৩১ অক্টোবর ৩৫০ বছর আগে বিলুপ্ত ডোডো পাখি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছেন বিজ্ঞানীরা! ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বাড়তি বেতন, তবে পাচ্ছেন না সবাই ভুয়া বিলের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকের মামলা ১৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে পীরগঞ্জে তিন হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

থ্রি-হুইলারের ব্যাটারি বর্জ্যে সীসার বিষ, ঝুঁকিতে কোটি শিশু

  • সবশেষ আপডেট : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬৪ জন সংবাদটি দেখেছেন

স্বাদহীন, গন্ধহীন এবং খালি চোখে অদৃশ্য ভারী ধাতু সীসা। অথচ এই বিষাক্ত উপাদানই নিঃশব্দে ক্ষতিগ্রস্ত করছে দেশের শিশুদের মেধা, শারীরিক বিকাশ ও স্বাভাবিক জীবন। আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর শরীরে সীসার দূষণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার আশপাশে অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি কারখানা, পুরোনো ব্যাটারি ভাঙা ও গলানো, পাশাপাশি থ্রি-হুইলার ও ই-রিকশার ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে সীসা। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশুদের ওপর।

সাভারের আশুলিয়ার কাঠগোড়া এলাকার আট বছরের অনিকের গল্প সেই বিপদেরই একটি উদাহরণ।

সকাল হলেই আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠত পোড়া ব্যাটারির ধোঁয়া ও গন্ধে। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যেত বসতবাড়ির পাশের আকাশ। অথচ সেই জায়গাটিই ছিল অনিকের খেলার মাঠ। বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলত, দৌড়াদৌড়ি করত। ব্যাটারি পোড়ানোর জায়গাটির পাশ দিয়েই যাতায়াত করত স্কুলে।

তখনও অনিক জানত না, যে ধোঁয়া তার নাক-মুখ দিয়ে শরীরে ঢুকছে কিংবা যে ধুলায় সে খেলছে, সেখানেই মিশে আছে বিষাক্ত সীসা।

একপর্যায়ে রক্ত পরীক্ষায় অনিকের শরীরে সীসার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ গুণের বেশি পাওয়া যায়।

গবেষণায় দূষণের উৎস শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাটারি পোড়ানোর স্থানটি বন্ধ করা হয় এবং এলাকাটি পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু ততদিনে অনিকের শরীরে সীসার ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে।

অনিকের ভাষায়, ‘পড়তে বসলে অনেক কিছু ভুলে যাই। মনোযোগ ধরে রাখতে খুব কষ্ট হয়।’

তার মা শারমিন আক্তারও এখনো উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘এখন অনিক কিছুটা ভালো। কিন্তু সীসার ক্ষতি পুরোপুরি যায়নি। তার স্মৃতিশক্তির সমস্যা রয়ে গেছে।’

অনিকের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং এবং ব্যবহৃত ব্যাটারির অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা শিশুদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

আইসিডিডিআর,বির গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারি তৈরির কারখানা বা সীসা গলানোর শিল্পস্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

দেশে ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও ই-রিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও এসব যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারির শেষ পরিণতি কী হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫০ থেকে ৮০ লাখ অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার ও ই-রিকশা রয়েছে। এসব যানবাহন থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত ব্যাটারি ও সীসা বর্জ্য তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই বর্জ্যের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ রিসাইক্লিং চেইনে চলে যায়।

পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে সীসা সংগ্রহ, খোলা জায়গায় ব্যাটারি পোড়ানো কিংবা অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার ফলে সীসা মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকার পাশে এসব কার্যক্রম চললে শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

সীসার বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। শরীরে প্রবেশের পর সীসা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে শিশুদের শেখার সক্ষমতা, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সমস্যাটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে কারণ সীসা দূষণের কোনো স্বতন্ত্র গন্ধ বা দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। ফলে দূষিত পরিবেশে বসবাস করেও অনেক পরিবার বুঝতে পারে না যে তারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের নামে অনানুষ্ঠানিক ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধে সরকারি নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকার কাছাকাছি পুরোনো ব্যাটারি ভাঙা কিংবা সীসা গলানোর কাজ চললেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবহন, পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ সীসা গলানোর কারখানা বন্ধ, নিরাপদ রিসাইক্লিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ সীসা দূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের মেধা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ।

অনিকের মতো শিশুরা সেই অদৃশ্য বিষের শিকার হয়ে বেড়ে উঠছে। অথচ বিষটি দেখা যায় না, গন্ধ পাওয়া যায় না। তার ক্ষতিটা বোঝা যায় অনেক পরে।

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আরএনবি নিউজ ২০২৫-২৫
Theme Download From ThemesBazar.Com