ইসলামে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও অধিকার স্বীকৃত। জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা ভিন্নতার কারণে কাউকে মানবিক সম্মান থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সম্প্রদায় সম্পর্কেও ইসলামি শরিয়তে রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। ইবাদত, সামাজিক জীবন, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক বিধানের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান নিয়ে ইসলামি ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।
জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে ইমামের যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, তৃতীয় লিঙ্গের কোনো ব্যক্তির ইমামতি তার প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।
যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে পুরুষের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকে, তাহলে তাকে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। সে ক্ষেত্রে ইমামতির অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে তিনি নামাজে ইমামতি করতে পারবেন।
অন্যদিকে, যদি নারীর বৈশিষ্ট্য বেশি থাকে বা নারী-পুরুষ উভয় বৈশিষ্ট্য সমানভাবে বিদ্যমান থাকে, তাহলে পুরুষদের জামাতে ইমামতি করার অনুমতি নেই। তবে নারীদের জামাতে ইমামতি করার বিষয়ে শরিয়তের নির্ধারিত বিধান প্রযোজ্য হবে।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে সাধারণভাবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে তিনটি ভাগে আলোচনা করা হয়েছে।
যাদের মধ্যে পুরুষের লক্ষণ ও সক্ষমতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তাদের পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিয়ে, উত্তরাধিকার, পর্দা ও অন্যান্য সামাজিক বিধানে পুরুষের বিধানই তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
যাদের মধ্যে নারীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য বেশি প্রকাশ পায়, তাদের নারী হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে বিবাহ, পর্দা, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নারীর বিধান অনুসরণ করা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির মধ্যে নারী বা পুরুষের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে। ইসলামি ফিকহে এ ধরনের ব্যক্তিকে ‘খুনসায়ে মুশকিলা’ বলা হয়। এ অবস্থায় আলামত, চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়।
ফকিহদের মতে, পরিচয় স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে, পর্দা ও উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, আদমসন্তানকে সম্মানিত করা হয়েছে এবং তাদের জন্য উত্তম জীবনযাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া বা আল্লাহভীতির ভিত্তিতে; জন্ম, বংশ বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নয়।
ধর্মীয় শিক্ষাবিদরা বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের প্রতি বৈষম্য নয়, বরং সম্মান, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ইসলামি মূল্যবোধের অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ধর্মীয় অনুশীলন এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার রক্ষা করা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব।
ইসলামি শরিয়তের আলোকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিচয় ও বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হলো তাদের মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা।