রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাসুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও কাটেনি আতঙ্ক। সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা, কিন্তু উৎসবের আমেজের বদলে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কি থমকে গেছে?
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সরেজমিনে মাসুয়াপাড়া মহল্লা ঘুরে দেখা যায়, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে এখনও পুলিশ পাহারা রয়েছে। তবে মহল্লার একমাত্র মন্দিরে পূজার প্রস্তুতি চললেও নেই আগের বছরের মতো উৎসবমুখর পরিবেশ। মূর্তি নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও সাজসজ্জা ও আয়োজন সীমিত রাখা হয়েছে।
মন্দিরের সহকারী পুরোহিত অভিলাষ বর্মন বলেন, “ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে পূজার আয়োজন করছি। তবে মানুষের মনে এখনও ভয় ও শোক কাজ করছে। তাই এবার পূজার আয়োজনও অনেকটাই সাদামাটা।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২১ আগস্টের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেকেই অকারণে বাইরে বের হতে সাহস পান না। শিশুদের মধ্যেও উৎসবের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস নেই।
স্থানীয় গৃহবধূ তুলশী দাস বলেন, “একটি পরিবারের চারজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর পর কীভাবে স্বাভাবিক থাকা যায়? পূজা করবো, কিন্তু আনন্দটা আর আগের মতো নেই।”
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন আশিষ দাস। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস করছি। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে দেখিনি। ঘটনার প্রকৃত রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তাই মানুষের মনে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।”
মনু বালা দাস নামে এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আমরা এখনও আতঙ্কে আছি। পূজা আসছে, কিন্তু আনন্দের চেয়ে ভয়ই বেশি কাজ করছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো তথ্য না পাওয়ায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ দাসের পরিবারেও নেই পূজার প্রস্তুতি। তার বাবা বিনয় দাস বলেন, “ছেলে কারাগারে। পরিবারের সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। এমন অবস্থায় উৎসবের আয়োজন করার মতো পরিস্থিতি নেই।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য পূজা উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের এক সভায় মাসুয়াপাড়াসহ সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
উল্লেখ্য, গত ২১ আগস্ট রংপুর নগরীর মাসুয়াপাড়া মহল্লা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রতীলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তের অংশ হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ৩৫ ধরনের আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত ফরেনসিক প্রতিবেদন না আসায় হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ রহস্য উন্মোচিত হয়নি।
এ অবস্থায় দুর্গাপূজাকে ঘিরে উৎসবের চেয়ে নিরাপত্তা ও বিচার নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশাই এখন মাসুয়াপাড়াবাসীর প্রধান চাওয়া।