বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
কৌশলগত অংশীদারত্বে কর্মীদের কল্যাণে নতুন উদ্যোগ আকিজ রিসোর্সের তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার সমাজকল্যাণমন্ত্রী শক্তি বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের, বুধবার অন্ধ্র উপকূলে আঘাতের শঙ্কা পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবকের বাড়িসহ তিন বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ২ অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি ২৯ অক্টোবর হচ্ছে না এইচএসসির ফল, নতুন তারিখ ৩১ অক্টোবর ৩৫০ বছর আগে বিলুপ্ত ডোডো পাখি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছেন বিজ্ঞানীরা! ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বাড়তি বেতন, তবে পাচ্ছেন না সবাই ভুয়া বিলের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকের মামলা ১৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে পীরগঞ্জে তিন হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

বঙ্গোপসাগরে নজরদারিতে ৪ স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা, ব্যয় হতে পারে ৬০০ কোটি টাকা

  • সবশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৮০ জন সংবাদটি দেখেছেন
বঙ্গোপসাগরে নজরদারিতে ৪ স্যাটেলাইটের পরিকল্পনা, ব্যয় ৬০০ কোটি টাকা
বঙ্গোপসাগরে নজরদারিতে ৪ স্যাটেলাইটের পরিকল্পনা, ব্যয় ৬০০ কোটি টাকা

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌযানের অবস্থান শনাক্ত, সমুদ্রে চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। এ জন্য মহাকাশে কম উচ্চতায় চারটি স্যাটেলাইট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী নৌযানের অবস্থান, গতি ও গতিপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করছে বিএসসিএল।

চার স্যাটেলাইট ও দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা

বিএসসিএলের প্রস্তাব অনুযায়ী, সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার জন্য চারটি স্যাটেলাইট, দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য দেশের অভ্যন্তরে সার্ভার অবকাঠামো স্থাপন করা হবে।

এ ব্যবস্থায় বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট কোনো এলাকা সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পরপর পুনরায় পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে একে ‘রিভিজিট টাইম’ বলা হয়।

প্রচলিত এআইএস ব্যবস্থায় উপকূলীয় রেডিও অবকাঠামোর মাধ্যমে নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যবস্থায় সমুদ্রের দূরবর্তী এলাকায় থাকা নৌযানের সংকেতও গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

তবে এআইএস যন্ত্র স্থাপন করা নেই কিংবা সংকেত বন্ধ রাখা হয়েছে—এমন নৌযান শনাক্তের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকবে।

বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ

২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় মৎস্য আহরণ, নৌযান চলাচল, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহার এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়। সেটি মূলত যোগাযোগ ও সম্প্রচারের কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে নতুন প্রস্তাবিত স্যাটেলাইটগুলোর কাজ হবে সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযানের সংকেত শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা।

বিএসসিএল জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হলে জাতীয় পর্যায়ে সামুদ্রিক তথ্যের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের আশা

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানিয়েছেন, অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এরপর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত করে স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে হবে।

চলতি বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সমুদ্রে জেলেদের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়, দুর্যোগ কিংবা দিক হারিয়ে অনেক সময় বিপদে পড়েন জেলেরা। কখনো ট্রলারডুবি ঘটে, আবার কখনো স্রোতের টানে নৌযান ভিনদেশের জলসীমায় চলে যায়।

ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ অ্যাকটিভিটি বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় এলাকার ৫০ লাখের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ।

অন্যদিকে লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের ‘ফিশসেফ’ ২০২৫ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ হাজার ৩৫০ জনের বেশি জেলে সমুদ্রে প্রাণ হারান।

প্রস্তাবিত স্যাটেলাইট ব্যবস্থা নৌযানের অবস্থান পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। তবে জরুরি যোগাযোগ ও উদ্ধার কার্যক্রমে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নৌযানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর।

অবৈধ মাছ ধরা ও নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণ

মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি মাছ ধরার নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে নির্দিষ্ট গভীরতার বাইরে মাছ ধরার নিয়ম থাকলেও কিছু নৌযান তা অনুসরণ করে না। নৌযানের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও চেকপোস্টের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা গেলে আইন প্রয়োগে সুবিধা হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে প্রায় ৩০ হাজার নিবন্ধিত ক্ষুদ্র মাছ ধরার নৌকা রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ৭০ হাজার অনিবন্ধিত নৌকা থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

তবে অনিবন্ধিত নৌকা মানেই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হবে, এমন নয়। এআইএস সংকেত না পাঠানো নৌযান শনাক্ত করতে বাড়তি প্রযুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।

বছরে ৪৫৯ কোটি টাকার জ্বালানি সাশ্রয়ের হিসাব

বিএসসিএলের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নৌযানের অবস্থান ও গতিপথের তথ্য ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে যাত্রা পরিচালনা করা গেলে জ্বালানি খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে।

সংস্থাটির হিসাবে, একটি নৌকা একবারের যাত্রায় সর্বোচ্চ ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সাশ্রয় করতে পারে।

এই হিসাবে বছরে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য ৪৫৯ কোটি টাকা।

তবে এটি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রাক্কলন। বাস্তবে কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: শুধু এআইএস যথেষ্ট নয়

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক ও স্যাটেলাইট বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান মনে করেন, শুধু এআইএস প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলে সমুদ্রে সব নৌযান শনাক্ত করা সম্ভব হবে না।

তাঁর মতে, এআইএসের পাশাপাশি সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার (এসএআর) প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে এআইএস সংকেত না পাঠানো নৌযানও শনাক্ত করা সম্ভব।

একই সঙ্গে চারটি স্যাটেলাইট দিয়ে প্রয়োজনীয় সমুদ্র এলাকায় কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে কি না, তা বিস্তারিতভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের ব্যয় ও সম্ভাব্য সুফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে একই ধরনের সেবা নেওয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হবে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

বঙ্গোপসাগরে নজরদারি বাড়াতে প্রস্তাবিত এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নৌযানের অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বাস্তবায়ন ব্যয়, পরিচালন খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন।

বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হওয়ার পরই স্যাটেলাইট নির্মাণ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আরএনবি নিউজ ২০২৫-২৫
Theme Download From ThemesBazar.Com