কাঁধে লাঠি, এক পাশে মাছ ধরার জাল, অন্য পাশে সিলভারের হাঁড়ি আর পুরোনো লুঙ্গি। মাছ ধরতে তিস্তা নদীর পথে রওনা হয়েছেন হরেন্দ্র নাথ দাস। অথচ দরজায় কড়া নাড়ছে দুর্গাপূজা, ঘরে নেই উৎসবের প্রস্তুতি। স্ত্রী, মা, ছেলে কিংবা নিজের জন্যও কেনা হয়নি নতুন কাপড়। মেয়ের বাড়িতেও পাঠাতে পারেননি কিছু। পূজার বাজার করতে হবে ধারদেনা করে।
যে তিস্তা একসময় তাঁর সংসারের ভরসা ছিল, সেই নদীতে এখন সারাদিন জাল ফেলেও মেলে না পর্যাপ্ত মাছ। আয় কমতে কমতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়বখা এলাকার মাঝিপাড়ায় হরেন্দ্র নাথের এই সংকট একার নয়। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বহু জেলে। কেউ বিক্রি করেছেন মাছ ধরার নৌকা, কেউ অন্যের জমিতে শ্রম দিচ্ছেন, আবার কেউ কাজের সন্ধানে ছুটছেন ঢাকায়। সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনার বই কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারছে না।
আগামীকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসব ঘিরে যখন কেনাকাটা ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে, তখন তিস্তাপাড়ের এসব পরিবারের ভাবনা, কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে পূরণ হবে সন্তানদের ছোট ছোট আবদার।
হরেন্দ্র নাথ দাসের জন্ম ১৯৬২ সালের ৫ জুন। পাঁচ সদস্যের পরিবারের খাবার জোগাতে প্রতিদিন তাঁকে যেতে হয় নদীতে। একসময় মাছ ধরে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারতেন। এখন সারাদিন জাল ফেলেও পুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেড় থেকে দুই কেজি মাছ পান। সেগুলো বিক্রি করে আয় হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
এই সামান্য আয়ে পরিবারের খাবারের খরচ মেটানোই কঠিন। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করতে হয়। মাছ কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজের নৌকাটিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে তাঁকে।
আক্ষেপ করে হরেন্দ্র নাথ বলেন, ‘তিস্তা নদীতে মাছ ধরে কামলার দাম জোটে না। মাছ নাই, তাই নৌকা বিক্রি করে দিয়েছি। মাছ ধরাই আমার পেশা। এটা ছাড়া আর কিছু করতেও পারি না। এলাকায় তেমন কাম নাই।’
পূজার আগে পরিবারের সদস্যদের নতুন পোশাক কিনে দিতে না পারার কষ্টও তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট। হরেন্দ্র নাথ বলেন, ‘স্ত্রী কাপড় চাইছে, দিতে পারি নাই। মা কাপড় চাইছে, দিতে পারি নাই। ছেলে চাইছে, দিতে পারি নাই। পূজা উপলক্ষে মেয়ের বাড়িতেও কিছু দিতে পারি নাই। নিজেরও কিছু নেইনি। টাকা নাই আমার কাছে, ধার নিয়ে বাজার করা লাগবে।’
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭টি। এর মধ্যে তিস্তা তীরবর্তী বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও নাজিমখান ইউনিয়নের ৬৮৬টি পরিবার সংকটে রয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ১৭৫টি, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় ৩৮০টি এবং নাজিমখানে ১৩১টি জেলে পরিবার রয়েছে।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাড়ামৌলা এলাকার জেলে আব্দুল জলিলের জীবনেও বদলে গেছে নদীর ওপর নির্ভরতার হিসাব। একসময় মাছ ধরেই ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ চালাতেন। এখন সংসার চালাতে অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। কখনো কাজের সন্ধানে যেতে হয় ঢাকায়।
আব্দুল জলিল বলেন, ‘নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। আগে মাছ ধরেই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। কখনো আবার ঢাকায় গিয়ে কাজ করে সংসার চালাতে হয়।’
তৈয়বখা এলাকার জেলে সবুজ কুমার দাসের পরিবারে সদস্য ছয়জন। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় তাঁর আয়ও অনিশ্চিত। পরিবারের কারও জন্যই পূজার নতুন পোশাক কিনতে পারেননি। সংসারের খরচের পাশাপাশি সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
সবুজের দাবি, গত পাঁচ বছরে সহায়তা হিসেবে ১০ কেজি চালও পাননি। তাঁর একটি টিসিবি কার্ড রয়েছে। তবে সেখান থেকে পণ্য কিনতেও টাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছেলের পড়াশোনা নিয়ে। পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে ছেলে, অথচ এখনো কিনে দিতে পারেননি গাইড বই। বই কেনার টাকা জোগাড় করতে শেষ পর্যন্ত মুরগি বিক্রির কথা ভাবছেন তিনি।
পরিবারের কাছে তাই পূজার নতুন পোশাকের চেয়েও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের খরচ মেটানো এবং সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া।
জেলেদের অভিযোগ, তিস্তা নদীতে বালু-পলি জমে নাব্যতা কমেছে। বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় পানির প্রবাহ ও মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বড় অংশ বালুচরে পরিণত হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা।
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেন, নদীদূষণ, নাব্যতা কমে যাওয়া ও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও পরিবেশ কমে যাচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদন কমছে, যার প্রভাব পড়ছে জেলেদের জীবিকায়। আগের তুলনায় তাঁদের জালে মাছও কম ধরা পড়ছে।
মাছের সংকটে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে জেলেদের। তাঁদের দাবি, সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেলেও সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর সহায়তা তাঁরা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেন, মৎস্যজীবী কার্ডধারীরা বিভিন্ন সমিতি গঠন করে জলমহল ইজারা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। তবে এ উপজেলায় জেলেদের নামে বরাদ্দ হিসেবে কোনো অনুদান আসে না। সরকার থেকে এ ধরনের বরাদ্দ এলে সংশ্লিষ্ট জেলেরা তা পাবেন। সহায়তার প্রয়োজন হলে সমিতির মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন করতে পারেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্য, এখন পর্যন্ত উপজেলায় জেলেদের জন্য কোনো অনুদান দেওয়া হয়নি। তবে জেলেদের প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করেন তাঁরা।
তিস্তাপাড়ে দুর্গাপূজা আসছে, কিন্তু অনেক জেলে পরিবারের ঘরে নেই উৎসবের আয়োজন। নদীতে মাছ কমেছে, কমেছে আয়ও। একসময় যে নদী তাঁদের সংসারে সচ্ছলতা এনে দিত, সেই নদীর ওপর নির্ভর করেই এখন প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ের লড়াই চলছে। নতুন পোশাক কিংবা উৎসবের আনন্দের আগে তাঁদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার হিসাব।