প্রায় ৭০ বছরের সংসার। জীবনের দীর্ঘ পথজুড়ে অভাব-অনটন, অসুস্থতা আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও একে অপরের পাশে ছিলেন তাঁরা। শেষ বয়সে অসুস্থ স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে খাবারের জন্য আকুতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিলেন শেরপুরের ৮৮ বছর বয়সী সাজু শেখ। এবার সেই দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী নূরজাহান বেগমকে চিরদিনের জন্য হারালেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাড়িতে মারা যান ৮২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইলিয়াস মিয়া।
তিনি জানান, রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে নূরজাহান বেগমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহান বেগমের। এরপর থেকেই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না তিনি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। একপর্যায়ে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ ও পরিচর্যার প্রয়োজন হলেও অভাবের সংসারে সেসবের ব্যবস্থা করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
নিজেও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তবুও অসুস্থ স্ত্রীকে একা ফেলে যাননি সাজু শেখ।
প্রতিদিন স্ত্রীর দেখাশোনা করার পাশাপাশি খাবার ও ওষুধ জোগাড়ের চিন্তায় কাটত তাঁর সময়।
একদিকে নিজের বার্ধক্য, অন্যদিকে স্ত্রীর দীর্ঘ অসুস্থতা—দুইয়ের সঙ্গে লড়াই করে চলছিল তাঁদের জীবন।
সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জীবনসঙ্গীর যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন সাজু শেখ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজু শেখের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
সেখানে অসুস্থ স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে খাবারের জন্য সাহায্য চাইতে দেখা যায় তাঁকে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এই বৃদ্ধ দম্পতির দুরবস্থার কথা জানতে পারেন অসংখ্য মানুষ।
তাঁদের অসহায়ত্বের চিত্র দেখে বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা খোঁজখবর নিতে শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে পরিবারটিকে খাদ্যসহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়।
তবে এত সহায়তার মধ্যেও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি নূরজাহান বেগম।

সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।
তাঁদের মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। তাঁরা মাঝেমধ্যে মা-বাবার খোঁজখবর নিতেন।
তিন ছেলের একজন করোনা মহামারির সময় নিখোঁজ হন বলে পরিবার জানিয়েছে।
আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। বছরে এক-দুবার বাড়িতে আসেন তিনি।
ছোট ছেলে নূর ইসলাম শেরপুরে দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সংসার চালান।
কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিন মেয়েকে নিয়ে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় নূর ইসলামকে।
ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য পরিবারের ছিল সীমিত।
সাজু শেখের পরিবারের দুরবস্থার বিষয়টি জানার পর স্থানীয় প্রশাসনও সহায়তায় এগিয়ে আসে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, প্রশাসনের উদ্যোগে পরিবারটিকে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য দেওয়া হয়েছে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
এ ছাড়া দেশ-বিদেশের অনেক সহৃদয়বান মানুষ পরিবারটিকে সহযোগিতা করেছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর খবরও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
প্রায় সাত দশকের দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখ, অভাব আর অসুস্থতার মধ্যেও একসঙ্গে ছিলেন সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম।
শেষ বয়সে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে থেকে যতটুকু সম্ভব সেবা করার চেষ্টা করেছেন সাজু।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের জীবনের সংগ্রামের চিত্র অনেক মানুষের সহানুভূতি অর্জন করেছিল।
কিন্তু দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে হারিয়ে এখন একা হয়ে পড়লেন ৮৮ বছরের সাজু শেখ।
পরিবারটির আর্থিক সংকট এবং সাজু শেখের বার্ধক্য বিবেচনায় তাঁর আগামী দিনের জীবনযাপন ও পরিচর্যার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।