
কিম জং–উনের বিলাসী জীবনের রহস্য, স্যাটেলাইটে ধরা পড়ল চার প্রমোদতরি
উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ যখন খাদ্যসংকট ও কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে জীবনযাপন করছেন, তখন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং–উনের অবকাশকেন্দ্রের আশপাশে দেখা মিলেছে একাধিক বিলাসবহুল প্রমোদতরির।
কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান উপকূলে চারটি বড় নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
নৌযানগুলোর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ মিটার। সবচেয়ে বড় নৌযানটির ডেকে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ সুইমিংপুল এবং ওয়াটার স্লাইড।
ধারণা করা হচ্ছে, এসব নৌযান উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ও তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত অবকাশযাপনের জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে নৌযানগুলোর মালিকানা সম্পর্কে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়ানসান উপকূল ও আশপাশের দ্বীপগুলোর কাছে চারটি বড় নৌযান দেখা গেছে।
এগুলোর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৫০, ৫৫, ৬০ ও ৮০ মিটার।
সবচেয়ে বড় ৮০ মিটার বা ২৬৩ ফুট দীর্ঘ নৌযানটি কয়েক মাস মেরামতকেন্দ্রে থাকার পর গত জুলাইয়ের শুরুতে ওয়ানসানের কালমা উপদ্বীপের জলসীমায় নিয়ে আসা হয়।
জুলাই থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তোলা একাধিক স্যাটেলাইট ছবিতে নৌযানটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে।
অন্য তিনটি নৌযানও বিভিন্ন সময়ে কিম পরিবারের অবকাশকেন্দ্রের আশপাশে দেখা গেছে।
৮০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ডেকে থাকা বিশাল সুইমিংপুল।
প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ এই সুইমিংপুলের এক পাশে রয়েছে ওয়াটার স্লাইড।
এ ধরনের প্রমোদতরিতে ব্যক্তিগত বিনোদন ও অবকাশযাপনের নানা সুবিধা থাকতে পারে।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা নৌযানগুলোর প্রকৃত দাম জানা যায়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে একই ধরনের বিলাসবহুল প্রমোদতরির মূল্য কয়েক কোটি থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে।
এর আগে কিম জং–উনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৯ মিটার দীর্ঘ একটি প্রিন্সেস প্রমোদতরির আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল ৭০ লাখ ডলার।
উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান শহর সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
সেখানে কিম জং–উন ও তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিম পরিবারের সঙ্গে এই শহরের সম্পর্ক বহু পুরোনো।
জীবনীকার ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কিম জং–উন শৈশবের একটি বড় সময় তাঁর মায়ের সঙ্গে ওয়ানসানে কাটিয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ার সাবেক কর্মকর্তা রি জং হো বিবিসিকে জানান, শীতকালে এসব নৌযান জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে রাখা হয়। গ্রীষ্মকালে সেগুলো কিম পরিবারের অবকাশকেন্দ্রের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়।
তাঁর দাবি, পরিবারের সদস্যদের সাঁতার ও বিনোদনের কাজে নৌযানগুলো ব্যবহার করা হয়।
রি জং হো একসময় উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির ‘৩৯ নম্বর দপ্তরে’ কাজ করতেন। এই দপ্তর শাসকগোষ্ঠীর বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা হয়।
স্যাটেলাইট ছবিতে ৫০ ও ৫৫ মিটার দীর্ঘ দুটি নৌযানকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ওয়ানসানের কাছে তে ও সিন দ্বীপের আশপাশে দেখা গেছে।
৫০ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযানের পাশে চারটি ছোট নৌকাও শনাক্ত করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষক জং সঙ–হাকের মতে, ছোট নৌকাগুলো বড় নৌযানে যাত্রী, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
তিনি মনে করেন, ছোট দ্বীপগুলোর অবস্থান ব্যক্তিগত অবকাশযাপনে গোপনীয়তা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে ৬০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটিকেও অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত কিমের ওয়ানসানের বাসভবনের কাছে দেখা গেছে।
তবে এসব নৌযানের অবস্থান থেকে কিম জং–উন বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঠিক কখন সেখানে অবস্থান করেছেন, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর বিলাসবহুল জীবনযাপনের সম্ভাব্য চিত্রের বিপরীতে দেশটির সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক কঠিন।
জাতিসংঘের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বহু নাগরিক গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের শিকার।
দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকটের কারণে দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ছিল প্রায় ৬৬৭ মার্কিন ডলার।
একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৩৬ হাজার ২২৭ ডলার।
অর্থনৈতিক এই বৈষম্যের কারণে উত্তর কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষের কাছে বিলাসবহুল অবকাশযাপন অনেকটাই নাগালের বাইরে।
উত্তর কোরিয়া ছেড়ে যাওয়া কয়েকজন নাগরিক বিবিসিকে জানিয়েছেন, দেশটির শ্রমিক, দপ্তরের কর্মী ও সমবায় খামারের কৃষকদের বছরে ১৪ দিনের ছুটি পাওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেকেই তা ভোগ করতে পারেন না।
শুধু ছুটির সীমাবদ্ধতাই নয়, দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়।
ফলে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ সীমিত।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওয়ানসান কালমা পর্যটনকেন্দ্র চালু করা হয়।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বহুতল হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, ক্রীড়াসুবিধা এবং জলবিনোদনকেন্দ্র রয়েছে।
একসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমে সেখানে রুশ পর্যটকদের ভ্রমণের ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদমাধ্যম নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার কিছু স্থানীয় বাসিন্দার জন্য চার রাতের একটি ভ্রমণ প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১০০ ডলার।
তবে দেশটির সাধারণ মানুষের আয় বিবেচনায় এই অর্থও অনেকের জন্য বড় ব্যয়।
২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন সাবেক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান।
সফর শেষে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানকে তিনি জানিয়েছিলেন, কিম জং–উনের সঙ্গে ওয়ানসানে সময় কাটিয়েছেন।
সেখানে তাঁরা জেট স্কি চালিয়েছেন এবং ঘোড়ায় চড়েছেন।
রডম্যানের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁরা প্রায় ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি বিলাসবহুল নৌযানও ব্যবহার করেছিলেন।
তবে বর্তমানে স্যাটেলাইট ছবিতে শনাক্ত হওয়া ৬০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটি সেই একই নৌযান কি না, তা নিশ্চিত নয়।
উত্তর কোরিয়ার সরকার এসব বিলাসবহুল নৌযানের মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
তবে দেশটির সাবেক কর্মকর্তা, দেশত্যাগী নাগরিক এবং উত্তর কোরিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শাসকগোষ্ঠীর বাইরের কারও পক্ষে এমন নৌযান ব্যবহার বা মালিকানা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
স্যাটেলাইট ছবিতে কিম পরিবারের অবকাশকেন্দ্রের কাছে