জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দেশটির বিভিন্ন শহরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাংবাদিক ক্যাটরিন বেনহোল্ড ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা, মাখোঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং কট্টর ডানপন্থীদের তৎপরতার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে চলতি মাসের শুরুতে ফ্রান্সের হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নামেন।
পরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে যোগ দেন শ্রমিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের একটি অংশ।
গত শনিবার দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। দোকানপাট ভাঙচুর, লুটপাট, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনের হিসাবে, সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে জানানো হয়।
বিক্ষোভের শুরুতে প্রেসিডেন্ট মাখোঁর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন মাখোঁ ব্রিটানির উপকূলের কাছে একটি যুদ্ধজাহাজে সামরিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছিলেন।
ওই সময় পরিস্থিতি নিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব পালন করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
পরে রোববার মাখোঁ জনসমক্ষে বক্তব্য দেন। তবে ততক্ষণে আন্দোলন বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি মাখোঁর নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগের মধ্যে দূরত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০১৭ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এমানুয়েল মাখোঁ।
সে সময় তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয় ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজনৈতিক বিভাজন কমানো এবং কট্টর ডানপন্থীদের প্রভাব মোকাবিলা করা।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মেরিন লো পেনকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন তিনি।
বাম ও ডানপন্থী রাজনীতির প্রচলিত বিভাজনের বাইরে গিয়ে ফ্রান্সকে ঐক্যবদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছিলেন মাখোঁ।
কিন্তু প্রায় এক দশক পর দেশটির অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অসন্তোষ তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
মাখোঁর অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ব্যবসায় বিনিয়োগ সহজ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানো।
তাঁর শাসনামলে করপোরেট কর ও আয়কর কমানো হয়। সম্পদের ওপর আরোপিত একটি করও বাতিল করা হয়।
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনতে পারেনি।
একই সঙ্গে সরকারি ঋণ ও রাজস্বঘাটতির চাপ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, আগামী বছর ফ্রান্সের সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা খাতের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় হতে পারে।
অবশ্য ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর অনেকগুলো মাখোঁর ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির মতো বৈশ্বিক ঘটনাও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভের আগেই মাখোঁর প্রতি জনসমর্থন ১৫ শতাংশে নেমে এসেছিল।
তবে এই সংখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জরিপের প্রতিষ্ঠান, নমুনা ও পদ্ধতির বিস্তারিত সরবরাহ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
ফ্রান্সে চলমান রাজনৈতিক অসন্তোষের মধ্যে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক কার্যক্রম বাড়িয়েছে মেরিন লো পেনের দল ন্যাশনাল র্যালি।
দলটির নেতারা চলমান সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সরকারের সমালোচনার অন্যতম বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন।
ন্যাশনাল র্যালির সভাপতি জর্ডান বারদেলা দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে মেরিন লো পেন ভিডিও বার্তায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের বিষয় তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে, অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
তবে বর্তমান বিক্ষোভের কারণে কোনো নির্দিষ্ট দল নির্বাচনে জয়ী হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
২০১৭ সালে মাখোঁর উত্থানকে ফ্রান্সের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব কমানো।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের রাজনীতিতে সেই দলগুলোর সক্রিয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ঋণ, শিক্ষা খাত, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পায়, সেদিকেই নজর থাকবে।