দুই পাশে ঘন পাহাড়ি জঙ্গল, মাঝখানে আঁকাবাঁকা পিচঢালাই সড়ক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পথটি এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আতঙ্কের নাম। দিনের আলোতেও ভয়ে ভয়ে চলাচল করতে হয়। আর সন্ধ্যা নামলেই প্রায় বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল।
এমন পরিস্থিতি কক্সবাজারের ঈদগাঁও–ঈদগড়–বাইশারি সড়কে। প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে ডাকাতি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি দিনের বেলায় অন্তত ৬০টি যানবাহনে ডাকাতির ঘটনার পর সড়কটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ও দুপুরে সড়কের হিমছড়ি ঢালা এলাকায় দুই দফায় অন্তত ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুর্বৃত্তরা সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন থামায়। এরপর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা, মুঠোফোন ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে।
কখনো যাত্রীদের পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করা হয়। সোমবারের ঘটনায় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট চললেও ঘটনাস্থলে পুলিশের টহল দেখা যায়নি।
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঈদগাঁও–ঈদগড়–বাইশারি সড়ক।
প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক ব্যবহার করেন দেড় লাখের বেশি মানুষ।
সড়কটির প্রথম সাত কিলোমিটার কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলায়, পরবর্তী পাঁচ কিলোমিটার রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নে এবং শেষ পাঁচ কিলোমিটার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারি ইউনিয়নে অবস্থিত।
পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলঘেরা সড়কটি স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
কিন্তু ধারাবাহিক অপরাধের কারণে এই সড়কে চলাচল ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে সড়কটিতে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতা বাড়তে থাকে।
গত ১৭ বছরে এই সড়কে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৫০টির বেশি।
অপহৃত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৩ জন মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২০ সালের ৮ অক্টোবর হিমছড়ি ঢালা এলাকায় ডাকাতের গুলিতে নিহত হন আঞ্চলিক গানের শিল্পী জনি দে ও দিনমজুর মো. কালু।
জনি দের বাবা তপন দে জানিয়েছেন, ছেলের হত্যার ঘটনায় মামলা হলেও এখনো বিচার পাননি তিনি।
এর আগে ২০০৯ সালের ৯ নভেম্বর ডাকাতের গুলিতে নিহত হন ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পের সদস্য নায়েক সুশময় চাকমা।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাইশারি এলাকায় গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয় কাঠ ব্যবসায়ী জাফর আলমকে।
সড়কটিতে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঈদগড় থেকে ঈদগাঁও যাওয়ার পথে অপহৃত হন ঈদগড়ের জঙ্গলকাটা মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান।
তাঁকে পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রেখে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপহরণকারীরা তাঁর পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
পরে পরিবারের সদস্যরা দুই লাখ টাকা দিয়ে তাঁকে মুক্ত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দিনেও চলতে ভয়, সন্ধ্যায় বন্ধ যানবাহন! কক্সবাজারের সড়কে ডাকাত আতঙ্ক
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সড়কটির প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশে ডাকাতি, হত্যা ও অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটে।
তাঁর অভিযোগ, সড়কটি একাধিক থানার আওতায় থাকায় অপরাধের ঘটনায় দায়িত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, পুলিশের একার পক্ষে এই দুর্গম এলাকায় ডাকাতি প্রতিরোধ করা কঠিন।
তাঁর দাবি, ঈদগড় ইউনিয়নের দুটি গ্রামে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের আস্তানা রয়েছে। এসব চক্রের সদস্যরা মাদক চোরাচালান, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত।
সড়কটির দুই পাশে পাহাড় ও গভীর জঙ্গল থাকায় অপরাধীরা হামলার পর দ্রুত আত্মগোপন করতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সরু ও আঁকাবাঁকা সড়ক, জনবসতির স্বল্পতা এবং স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও ঈদগড় এলাকায় কয়েকটি ডাকাত দলের আস্তানা রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, কয়েকজন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।
সড়কটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রায় তিন মাস আগে সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।
ওই প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে এবং শিগগিরই কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে সোমবারের ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ টি এম সিফাতুল মাজদার।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময় পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি এবং থানায় কোনো লিখিত অভিযোগও জমা পড়েনি বলে জানান তিনি।
ঈদগড় বাজার কমিটির সভাপতি নুরুল হুদা জানিয়েছেন, সড়কে ডাকাতি ও অপহরণ বন্ধের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর তল্লাশিচৌকি স্থাপনের দাবিও জানিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, নিয়মিত নিরাপত্তা টহল ও কার্যকর নজরদারি ছাড়া সড়কটিতে স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি যেন আতঙ্কের পথ না হয়ে ওঠে, সে জন্য দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা চান স্থানীয় বাসিন্দারা।