দীর্ঘ নয় বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্বোধনের পরই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রবেশমূল্য। এখন থেকে উদ্যানটিতে ঢুকতে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে গুনতে হচ্ছে ১০ টাকা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসীর অনেকে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান ও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে উদ্যানটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর উদ্যানটি খুলে দেওয়ায় স্বস্তি ফিরলেও প্রবেশ ফি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দর্শনার্থী ও নগর-পরিকল্পনাবিদেরা।

রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান কার্যালয় নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে অবস্থিত ওসমানী উদ্যান।
২১ দশমিক ৮৫ একর আয়তনের এই উদ্যানের নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামে।
উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের কারণে দীর্ঘ নয় বছর সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ ছিল এখানে।
কিন্তু নতুন করে চালুর পর জনপ্রতি ১০ টাকা প্রবেশ ফি নির্ধারণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
অথচ উদ্যানটি বন্ধ হওয়ার আগে এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টাকা দিতে হতো না।

রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন ফেসবুকে উদ্যান খুলে দেওয়ার খবর দেখে সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসেন।
কিন্তু প্রবেশপথে তাঁকে দুইজনের জন্য ২০ টাকার টিকিট কিনতে বলা হয়।
প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর পার্কটি খুললেও সেখানে প্রবেশের জন্য টাকা দিতে হবে, এমন নিয়ম তিনি প্রত্যাশা করেননি।
তাঁর মতো আরও কয়েকজন দর্শনার্থীও প্রবেশমূল্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ নয় বছর নগরবাসীকে উদ্যানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার পর এখন প্রবেশ ফি আরোপ করা যুক্তিসংগত নয়।
প্রবেশমূল্য নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, উদ্যানের পরিবেশ সুন্দর রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, উদ্যানের আশপাশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচল রয়েছে। প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা না হলে উদ্যানের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্যানটি পরিষ্কার রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে ফটকে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের একজন কর্মচারী জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা টিকিট বিক্রি করছেন।

ওসমানী উদ্যানে প্রবেশ ফি আরোপের সমালোচনা করেছেন নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।
তাঁর মতে, পার্ক ও খেলার মাঠের মতো জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব।
এসব স্থানে প্রবেশের জন্য জনগণের কাছ থেকে ফি নেওয়া অন্যায্য বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর আশঙ্কা, নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চার জন্য যাঁরা উদ্যানে আসতেন, প্রবেশমূল্যের কারণে তাঁদের অনেকে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়গুলো তদন্ত করার দাবি জানান তিনি।
ডিএসসিসি সূত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নামে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে।
কিন্তু ঠিকাদারি জটিলতা ও বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হয়।
প্রথমে ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজের দায়িত্ব পেলেও পরে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়।
২০২৩ সালে নতুন করে পিএফ করপোরেশনকে কাজ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি প্রবেশফটক নির্মাণের জন্য আরও ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নকশা পরিবর্তনের পর ওই কাজের ব্যয় কমিয়ে ৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
সব মিলিয়ে গত নয় বছরে উদ্যানটির বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

উদ্যানটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলেও ভেতরের সব কাজ ও সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি চালু হয়নি।
প্রথম আলোর সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্যানের দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি ছিল না।
অন্য জলাশয়ে কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল ও আবর্জনা দেখা গেছে।
এ ছাড়া কিছু স্থানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণসামগ্রীও পড়ে থাকতে দেখা যায়।
উদ্যানের নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, জিমনেসিয়াম, গাড়ি পার্কিং এবং খাবারের দোকানগুলোও তখনো চালু হয়নি।
একসময় বিপুল গাছপালা ও সবুজ পরিবেশের জন্য ওসমানী উদ্যানকে অনেকে ‘ঢাকার ফুসফুস’ বলতেন।
তবে সংস্কার ও নির্মাণকাজের সময় বহু গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে পরিবেশবাদীরা আন্দোলনও করেছিলেন।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, উদ্যানের উন্নয়নকাজে অতিরিক্ত কংক্রিটের ব্যবহার হয়েছে এবং সবুজের পরিমাণ কমেছে।
তাঁদের দাবি, ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী পার্কের সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের যে সীমা রয়েছে, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের অন্যতম সংযোজন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯০ ফুট উচ্চতার স্মৃতিস্তম্ভে ব্রোঞ্জের ওপর জুলাইয়ের শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্যানের দুই পাশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারণ করে ইংরেজি ‘24’ সংখ্যার আদলে দুটি প্রবেশফটক নির্মাণ করা হয়েছে।
উদ্যানের সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, পার্কটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া না হওয়া পর্যন্ত সিটি করপোরেশন নিজেই উদ্যানটির রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রবেশপথে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে নয় বছর পর খুলে দেওয়া একটি সরকারি উদ্যানে প্রবেশের জন্য অর্থ আদায় কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
নগরবাসীর একাংশের দাবি, রাজধানীর অন্যান্য উন্মুক্ত উদ্যানের মতো ওসমানী উদ্যানেও বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।