নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামী রোববার, ১ নভেম্বর থেকে চার মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাওয়ার কথা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তবে বেতন নির্ধারণে জটিলতার কারণে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে এই সুবিধা পাচ্ছেন না। নতুন কাঠামোয় কোথাও জুনিয়র কর্মচারীর বেতন সিনিয়রের চেয়ে বেশি হচ্ছে, আবার কোথাও পদোন্নতির পরও কমে যাচ্ছে মোট আয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রের বরাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় থাকা ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী ও ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সবাই এখনো নতুন নিয়মে বেতন নির্ধারণ করতে পারেননি।
যাঁদের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়নি, তাঁরা আপাতত পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাবেন। নতুন কাঠামোর বকেয়া অর্থ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয় নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের কার্যক্রম।
কিন্তু বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রেড, জ্যেষ্ঠতা, উচ্চতর গ্রেড এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবে অসংগতি দেখতে পান।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++-এর কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা।
সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন জানানো হলেও গত সোমবার পর্যন্ত অনেক আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি।
নতুন বেতনকাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা।
অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেড এগিয়ে ৭০০ টাকা।
কিন্তু কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের পর ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১২তম গ্রেডের একজনের মূল বেতন নির্ধারিত হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।
ফলে নিচের গ্রেডের কর্মচারী তুলনামূলক উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৭০০ টাকা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।
কর্মচারীদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণেই এমন অসংগতি তৈরি হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতা নিয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে।
কর্মচারীদের দেওয়া একটি উদাহরণ অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা হলে ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা।
পদোন্নতি পেয়ে নবম গ্রেডে তাঁর মূল বেতন ৫১ হাজার টাকা হলে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে ৪৫ শতাংশ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভাতা দাঁড়াবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।
অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা, কিন্তু বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা।
ফলে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতার সম্মিলিত হিসাবে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্ধিত সুবিধা তিন ধাপে কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে কর্মচারীদের অভিযোগ, ধাপে ধাপে সুবিধা কার্যকর করার পরও বিভিন্ন গ্রেডের বেতনে অসংগতি থেকে যাচ্ছে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় নির্ধারণেও জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
বেতন নির্ধারণের কাজে ব্যবহৃত আইবাস++ ব্যবস্থায় জটিলতার কারণেও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় আসতে পারেননি।
অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর থেকে সমস্যার সমাধান চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
তবে ১ নভেম্বরের আগে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অর্থ বিভাগ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জটিলতা নিরসনে কাজ চলছে এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, বেতন নির্ধারণের নিয়ম, গ্রেডবৈষম্য ও বাড়িভাড়া ভাতার অসংগতি দ্রুত দূর করতে হবে। যাতে সবাই নির্ধারিত সময়ে নতুন কাঠামোর আর্থিক সুবিধা পান।