নিচে সংবাদটি পত্রিকার উপযোগী করে সম্পাদনা ও পরিমার্জন করা হলো।
রংপুর প্রতিনিধি
রংপুর বিভাগে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। এবার রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে নয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে বিভাগে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।
রোববার (২ আগস্ট) দুপুরে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মারা যাওয়া শিশুটির নাম শাওন (৯ মাস)। সে নীলফামারী সদর উপজেলার সুইট মিয়ার ছেলে। শনিবার রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হামের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন ধরে শিশুটি জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গে ভুগছিল। অবস্থার অবনতি হলে তাকে রমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ২০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে লালমনিরহাট জেনারেল হাসপাতালে একজন, নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে পাঁচজন, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ মার্চ থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত রংপুর বিভাগের আট জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ হাজার ১৫০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৯৮ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ৫২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু। বিশেষ করে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা গ্রহণ করেনি অথবা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের মধ্যে জটিলতার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগের সব জেলা ও উপজেলা হাসপাতালকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ, সংক্রমণের উৎস অনুসন্ধান এবং রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
চিকিৎসকরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে শরীরে লালচে দানা, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করানো বা চিকিৎসা বিলম্বিত করলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ হাম প্রতিরোধে শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। পাশাপাশি অসুস্থ শিশুকে জনসমাগমে না নেওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় রংপুর বিভাগজুড়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।