ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ ও জনপ্রিয় করতে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে বড় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের সব লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) বা আন্তঃপ্রতিষ্ঠান চার্জ শূন্য হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী ও সেবা প্রদানকারীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে।
তবে প্রণোদনার অর্থ সরাসরি ব্যবসায়ীর হাতে দেওয়া হবে না। যোগ্য লেনদেনের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা পাবে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমবে এবং মার্চেন্টদের ওপর আরোপিত মাশুল কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলা কিউআর বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করা একটি একক ও আন্তঃসংযুক্ত কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে গ্রাহক অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারেন।
ফলে একজন ব্যবসায়ীকে আলাদা ব্যাংক বা এমএফএসের জন্য একাধিক কিউআর কোড রাখতে হয় না। একটি বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করা যায়।
বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ গ্রাহকের অর্থ যে প্রতিষ্ঠান থেকে যাচ্ছে এবং মার্চেন্ট যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করছেন, তাদের মধ্যকার নির্দিষ্ট আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি আর থাকবে না।
আগে বাংলা কিউআর লেনদেনে মোট ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) ছিল। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৩৫ থেকে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আইআরএফ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দিতে হতো। আইআরএফ শূন্য হওয়ায় এখন মার্চেন্টদের লেনদেন খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আইআরএফ শূন্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে সব ধরনের মার্চেন্ট মাশুল অবশ্যই শূন্য হয়ে যাবে। চূড়ান্ত মাশুল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল অনুমোদন করেছে। ব্যক্তিপর্যায়ে নিবন্ধিত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য বিক্রেতা এবং সেবা প্রদানকারীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করাই এর উদ্দেশ্য।
যোগ্য লেনদেনের বিপরীতে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ যে ব্যাংক বা এমএফএস মার্চেন্টকে বাংলা কিউআর সুবিধা দিয়েছে, তারা লেনদেনের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ প্রণোদনা পাবে।
অন্যদিকে গ্রাহক যে ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করবেন, সেই ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান পাবে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ একটি যোগ্য লেনদেনে মোট প্রণোদনার হার হবে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ।
প্রতিটি যোগ্য বাংলা কিউআরভিত্তিক এনপিএসবি লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ প্রণোদনা হিসাবের জন্য বিবেচিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে, ১ হাজার টাকার একটি যোগ্য লেনদেনে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাবে ১ টাকা এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান পাবে ২ টাকা। মোট প্রণোদনা হবে ৩ টাকা।
২ হাজার টাকার যোগ্য লেনদেনে মোট প্রণোদনা হবে ৬ টাকা। এর মধ্যে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাবে ২ টাকা এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান পাবে ৪ টাকা।
এখানে ২ হাজার টাকা বলতে প্রতিটি লেনদেনে প্রণোদনা হিসাবের সর্বোচ্চ সীমা বোঝানো হয়েছে। কোনো মার্চেন্ট সরাসরি ২ হাজার টাকা প্রণোদনা পাবেন না।
উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেন গ্রহণের খরচ কমানো। আইআরএফ শূন্য হওয়ায় সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমবে। এর সুফল মার্চেন্টদের ওপর আরোপিত মাশুল কমানোর মাধ্যমে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে গ্রাহক নগদ টাকা ছাড়াই ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থেকে সরাসরি কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন।
প্রণোদনার অপব্যবহার ঠেকাতে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেশি প্রণোদনা পাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি বড় লেনদেনকে একাধিক ছোট লেনদেনে ভাগ করা যাবে না। কৃত্রিমভাবে লেনদেনের সংখ্যা বাড়ানোও নিষিদ্ধ।
ব্যর্থ, বাতিল, রিভার্স, রিফান্ড, চার্জব্যাক কিংবা বিতর্কিত লেনদেনের বিপরীতে কোনো প্রণোদনা দেওয়া হবে না।
কোনো মার্চেন্টের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে তা পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করতে হবে। কৃত্রিম লেনদেন বা অন্যভাবে ব্যবস্থাটির অপব্যবহার প্রমাণিত হলে প্রণোদনার অর্থ ফেরত নেওয়া কিংবা পরবর্তী প্রণোদনার সঙ্গে সমন্বয় করা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট ১০ আগস্ট এ বিষয়ে পৃথক নির্দেশনা জারি করেছে। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে আগামী ১ অক্টোবর থেকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, বাংলা কিউআর ব্যবহারের মাধ্যমে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় আরও বেশি যুক্ত করা। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড তৈরি হওয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে।