জাতীয় নিরাপত্তা, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় বেসরকারি খাতের প্রথম সাবমেরিন কেবল প্রকল্পে আপাতত ছাড়পত্র না দেওয়ার কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজকে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ কিংবা কেবল স্থাপনের অনুমতি না দিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাকে জানানো হয়েছে।
বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটি ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই সরকারের এই অবস্থান সামনে এলো।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাকে (এনএসআই) এ বিষয়ে চিঠি দেয়।
উপসচিব কানিজ ফাতেমা স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিএসসিপিএলসিতে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পে লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এ অবস্থায় বিভাগের অগ্রায়নপত্র ছাড়া কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের অনাপত্তি বা অন্য কোনো ছাড়পত্র না দিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিডিনেট ‘সিএস ব্লু’ ও ‘এনডেভার’ নামে দুটি জাহাজকে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ এবং সাবমেরিন কেবল স্থাপনের অনুমতি দিতে সরাসরি এনএসআইয়ের কাছে আবেদন করে।
এর আগে মেটাকোর সাবকমও স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনএসআইয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও ছাড়পত্র পাওয়ার চেষ্টা করে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অবস্থান হচ্ছে, মূল বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো সংস্থা বা মন্ত্রণালয় যেন এককভাবে এমন ছাড়পত্র না দেয়।
বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটির পক্ষে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ভূমিকা নিয়েও প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করেই বিটিআরসি সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ছাড়পত্রের জন্য চিঠি দিয়েছিল। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ ধরনের তৎপরতাকে এখতিয়ারসংক্রান্ত জটিলতা হিসেবে দেখছে।
প্রকল্পটি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার হিসেবে চীনভিত্তিক হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক বা এইচএমএন কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানটিকে অনির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছে এবং তথ্য নিরাপত্তা ও গুপ্তচরবৃত্তির সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্পটির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে চীনের পক্ষ থেকেও কূটনৈতিক তৎপরতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি দুই পরাশক্তির বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে পড়েছে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর সম্ভাব্য রুট। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কেবলটির প্রায় ৯০ শতাংশ মিয়ানমারের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যাবে।
এতে ভবিষ্যতে কেবলের রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি মেরামতের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতীয় ডাটা নিরাপত্তার দিক থেকেও বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৯ সালে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিএসসিপিএলসিকে এই কেবল ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমাকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাতে আগ্রহ দেখায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের লাইসেন্স দেওয়া নিয়েও আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট ও মেটাকোরকে লাইসেন্স দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, গাইডলাইনে প্রথমে একটি লাইসেন্স দেওয়ার কথা থাকলেও পরে তা সংশোধন করে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।
লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান তিনটি পৃথকভাবে অবকাঠামো নির্মাণ না করে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট গাইডলাইনে এমন কনসোর্টিয়াম গঠনের সুযোগ নেই।
এ ছাড়া লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকে পরবর্তী আন্তর্জাতিক সংযোগের ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও প্রকল্পটিতে শুধু পূর্বমুখী সংযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মেটাকোর সরকারের অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়।
মেটাকোরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল হাকিমের দাবি, সরকারই তাদের লাইসেন্স দিয়েছে এবং সেই লাইসেন্সের ভিত্তিতেই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে সরকার তদন্ত করতে পারে, কিন্তু প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও তিনি ঝুঁকির দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের দুই প্রান্তে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং চীনা অ্যাকটিভ ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে ডাটা চুরির আশঙ্কা থাকার কথা নয় বলে দাবি করেন তিনি।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অবস্থান অনুযায়ী, বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটি এখনই চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়নি। বরং জাতীয় নিরাপত্তা, লাইসেন্সের শর্ত, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র আটকে রাখা হয়েছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি এর আগে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সব দিক যাচাই-বাছাই করে দেশের স্বার্থে যেটি সবচেয়ে উপযোগী হবে, সরকার সেই সিদ্ধান্ত নেবে।
ফলে এখন নজর থাকবে, নিরাপত্তা ও লাইসেন্সসংক্রান্ত আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি করে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্প শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায় কি না, নাকি জাতীয় নিরাপত্তার বিবেচনায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে যায়।