পটুয়াখালীর দশমিনায় আইফোন কেনার জন্য নিজের শিশু সন্তানকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে। তিন পাতার একটি চুক্তিপত্রে শিশুটিকে ‘দত্তক’ দেওয়ার বিনিময়ে এক লাখ টাকা নেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। তবে অভিযুক্ত বাবা সন্তান বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলেন এবং সন্তানকে লালন-পালনের জন্য অন্যের কাছে দিয়েছিলেন।
ঘটনাটি ঘটেছে দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামে। অভিযুক্ত মো. মারুফ মুন্সি ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে। পেশায় তিনি কাঠমিস্ত্রি।
ঘটনা জানাজানির পর পুলিশ মারুফকে আটক করে। পরে শিশু জাহিদুল ইসলাম মুসাকে উদ্ধার করে তার দাদা-দাদির জিম্মায় দেওয়া হয়।
শিশুটিকে অন্যের কাছে দেওয়ার বিষয়ে করা তিন পাতার একটি চুক্তিপত্রে প্রথম পক্ষ হিসেবে মো. মারুফ (২২) এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে মো. ইমরানের (২৮) নাম রয়েছে।
চুক্তিপত্রে মারুফের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তার স্ত্রী চলে যাওয়ার কারণে শিশু সন্তানকে লালন-পালন ও দেখাশোনা করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে ছেলে জাহিদুল ইসলাম মুসাকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ইমরানের কাছে ‘দত্তক’ দেওয়া হয়েছে।
চুক্তিপত্রে শিশুটির জন্মতারিখ ১১ মে ২০২৫ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে মারুফ কিংবা তার উত্তরাধিকারীরা শিশুটিকে ফেরত চেয়ে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে কোনো দাবি করতে পারবেন না।
চুক্তিপত্রে মারুফ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে এতে স্বাক্ষর করেছেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।
তবে সন্তান বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মারুফ মুন্সি। তার দাবি, শিশুটিকে বিক্রি নয়, লালন-পালনের জন্য অন্যের কাছে দেওয়া হয়েছিল।
মারুফ বলেন, ‘আমি আমার সন্তান বিক্রি করিনি। যাদের কাছে দেওয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে সন্তান বিক্রির কোনো চুক্তিও হয়নি। সন্তানটিকে শুধু লালন-পালনের জন্যই তাদের কাছে দিয়েছিলাম।’
চুক্তিপত্রে টাকার উল্লেখ থাকার কথা স্বীকার করলেও এক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
মারুফের দাবি, ‘আমি একটি কাগজে স্বাক্ষর করেছিলাম এবং সেখানে টাকার কথা উল্লেখ ছিল। তবে তা এক লাখ টাকা নয়, আমি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলাম।’
তার কিছু দেনা ছিল জানিয়ে মারুফ বলেন, জরুরি দেনা পরিশোধের জন্য ওই টাকা নিয়েছিলেন এবং কিছুদিন পর সন্তানকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল।
তিনি বলেন, ‘সন্তান বিক্রির কোনো উদ্দেশ্যে বা স্বার্থে আমি তাকে দিইনি। এখন বিষয়টি নিয়ে চারপাশে অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি যে কাজটি আমার ভুল হয়েছে।’
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমের কাছ থেকে ছেলে মুসাকে ‘ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার’ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে স্বজনেরা জানতে পারেন, আলীপুর ইউনিয়নের রামনাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে শিশুটিকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে। ওই অর্থ দিয়ে মারুফ একটি আইফোন কিনেছেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে অভিযানে নামে পুলিশ। রোববার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় মারুফ মুন্সিকে আটক করা হয়। পরে রাত ১০টার দিকে শিশু মুসাকে উদ্ধার করে তার দাদা-দাদির জিম্মায় দেওয়া হয়।
এদিকে শিশুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসানের উদ্যোগে শিশু মুসার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলাসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।