ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সাহস ও ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা। ইসলামের ইতিহাসে তাঁর জীবন, কর্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস।
হজরত আলী (রা.)-এর নামে সংকলিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নাহজুল বালাগা’র বিভিন্ন খুতবার আলোকে তাঁর ১২টি শিক্ষণীয় বক্তব্যের ভাবার্থ তুলে ধরা হলো—
সমাজে যখন ফিতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়ে, তখন অহংকার পরিহার করে সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা জরুরি। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পথ অনুসরণ করাই মুমিনের জন্য কল্যাণের পথ।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ৫
সত্যের পথে একজন মুমিনের মনোবল হওয়া উচিত পাহাড়ের মতো দৃঢ়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য ও ন্যায়ের অবস্থান থেকে পিছিয়ে না গিয়ে আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ১১
পাপ মানুষকে এমন পথে নিয়ে যেতে পারে, যার পরিণতি ধ্বংস। বিপরীতে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি মানুষকে সংযম, কল্যাণ ও মুক্তির পথে পরিচালিত করে। তাই জীবনে প্রবৃত্তির অনুসরণ নয়, তাকওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ১৬
পবিত্র কোরআনের ভাষা যেমন মহিমান্বিত, এর শিক্ষা ও অর্থও তেমনি গভীর। কোরআনের জ্ঞান ও হিকমত থেকে মানুষের শেখার কোনো শেষ নেই। জীবনের জটিলতায় কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করা মুমিনের কর্তব্য।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ১৮
দুনিয়ার মোহ অনেক সময় মানুষকে সত্য উপলব্ধি করা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মৃত্যুর পর আফসোস করার সুযোগ থাকবে না। তাই জীবন থাকতেই সত্যকে গ্রহণ করে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ফিরে আসা উচিত।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ২০
মানুষের পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যু অনিবার্য। তাই পাপের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ২১
অভাবী ও বিপদগ্রস্ত আত্মীয়স্বজনের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। মানুষের প্রতি সদাচরণ, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পারস্পরিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ২৩
আল্লাহর রহমত কামনা করে তাঁর নির্দেশিত সরল পথে অটল থাকা মুমিনের কর্তব্য। জীবনের প্রতিকূলতায় ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে পরকালের কল্যাণের আশা করা যায়।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ২৪
সত্যবাদিতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা মানুষের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। পরকালের জবাবদিহিতে বিশ্বাসী মানুষ প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ৪১
দুনিয়ার জীবন দ্রুত ফুরিয়ে যায়, আর আখেরাত ক্রমেই কাছে আসে। তাই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে ডুবে না গিয়ে পরকালের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। আজ আমল করার সুযোগ আছে, কিন্তু একদিন আসবে যখন শুধু হিসাব দিতে হবে।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ৪২
পার্থিব জীবন স্থায়ী নয়। মানুষ এখানে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। তাই দুনিয়ার চাকচিক্যে বিভ্রান্ত না হয়ে নেক আমল, সততা ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ৬৩
প্রত্যেক মানুষই পৃথিবীতে সাময়িক সময়ের মুসাফির। মৃত্যু কখন আসবে, তা কারও জানা নেই। তাই সময় থাকতে তওবা, ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতের সফরের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত।
সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা ৬৪
হজরত আলী (রা.)-এর এসব প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্যের মূল শিক্ষা হলো—দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহের পরিবর্তে সত্য, ন্যায়, তাকওয়া, দায়িত্বশীলতা ও আখেরাতের প্রস্তুতিকে জীবনে প্রাধান্য দেওয়া। তাঁর জীবন ও শিক্ষা মুসলিম উম্মাহর জন্য যুগে যুগে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।