অর্থনীতি ডেস্ক
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের কম দামের চাপ এবং অর্ডারের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আগে থেকেই চাপে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। এর মধ্যে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে খাতটিতে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে কারখানার উৎপাদন, কাঁচামাল পরিবহন ও রপ্তানি পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর ব্যয়ে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে সেই বাড়তি খরচের সমপরিমাণ মূল্য আদায়ের সুযোগ সীমিত। ফলে মুনাফা কমার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
নতুন দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। ওই দিন রাত ১২টা থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।
এর আগে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছিল।
২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় দেশে খুচরা জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক ও বিনিময় হারসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় এ মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কম। ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৮ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার, যা কমেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। মোট পণ্য রপ্তানিতে পোশাক খাতের অংশ ছিল প্রায় ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ।

তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাই-আগস্টে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।
এই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং নিট পোশাক ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮১ ও ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ।
তবে জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে—বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সামলে এই প্রবৃদ্ধি কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পোশাকশিল্পে কয়েকভাবে পড়তে পারে।
প্রথমত, কারখানায় সরাসরি জ্বালানি ব্যবহারের ব্যয় বাড়বে। দ্বিতীয়ত, পরিবহন ব্যয় বাড়ায় আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই খরচ বাড়তে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করলে বিভিন্ন খাতে মজুরি বাড়ানোর দাবিও জোরালো হতে পারে।
তাঁর ভাষ্য, উৎপাদন খরচ বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়াতে চান না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা প্রতি মৌসুমে দাম কমানোর চেষ্টা করেন।
ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের এই ব্যবধান উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা সম্ভব না হলে তার একটি অংশ উদ্যোক্তাদের মুনাফা থেকেই বহন করতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য কিংবা ভর্তুকি কমানোর মতো কারণে সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়ে থাকতে পারে। তবে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অন্য পণ্য ও সেবার দাম যাতে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো না হয়, সেটি নজরদারি করা জরুরি।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়লেও সেই সুযোগে কেউ যেন কোনো পণ্য বা সেবার দাম ৫০ টাকা বাড়াতে না পারে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাংলাদেশের নেই। তাই দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্যান্য ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।
উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, লিড টাইম কমানো, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর মাধ্যমে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
পোশাক খাতের সংকটের চিত্র পাওয়া যায় কারখানা বন্ধের পরিসংখ্যানেও। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে ৪০২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে।
এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ২৮২টি এবং বিকেএমইএর সদস্য কারখানা ১২০টি।
বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটসহ বিভিন্ন কারণ এসব কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে কাজ করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
গ্যাসের সংকটে অনেক কারখানাকে উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি হলে বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করা কারখানার উৎপাদন ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়।
একই সঙ্গে কাঁচামাল কারখানায় আনা, তৈরি পণ্য বন্দরে নেওয়া এবং অন্যান্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে।
পোশাক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আগে থেকে নির্ধারিত অর্ডারের দাম মাঝপথে পরিবর্তনের সুযোগ খুবই সীমিত।
কোনো অর্ডারের উৎপাদন চলাকালে জ্বালানি, পরিবহন কিংবা অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলে তার পুরোটা বিদেশি ক্রেতার ওপর চাপানো কঠিন। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ উদ্যোক্তাকেই বহন করতে হয়।
এতে কারখানার মুনাফার ব্যবধান আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখতে না পারলে নতুন অর্ডার পাওয়া কিংবা পুরোনো ক্রেতা ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পোশাক রপ্তানিতে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খাতটির জন্য স্বস্তির হলেও সামনে রয়েছে বড় লক্ষ্য।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের অর্জনের তুলনায় যা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু নতুন অর্ডার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উৎপাদন সক্ষমতা সচল রাখা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনোয়ার মোস্তফার মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শিল্প খাতে স্পষ্টভাবে পড়তে পারে।
বড় আরএমজি ও টেক্সটাইল কারখানা প্রধানত গ্যাসনির্ভর হলেও প্রয়োজনের সময় তাদের ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। আবার ছোট ও মাঝারি শিল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল।
তাঁর মতে, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এতে রপ্তানিমুখী পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পোশাকশিল্পের সামনে হিসাবটি এখন শুধু প্রতি লিটার জ্বালানিতে বাড়তি ২০ টাকার নয়। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন, পরিবহন, শ্রম ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে এবং তার কতটা উদ্যোক্তাদের মুনাফা থেকে বহন করতে হবে—সেটিই এখন খাতটির জন্য বড় প্রশ্ন।