মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কৌশলগত অংশীদারত্বে কর্মীদের কল্যাণে নতুন উদ্যোগ আকিজ রিসোর্সের তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার সমাজকল্যাণমন্ত্রী শক্তি বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের, বুধবার অন্ধ্র উপকূলে আঘাতের শঙ্কা পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবকের বাড়িসহ তিন বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ২ অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি ২৯ অক্টোবর হচ্ছে না এইচএসসির ফল, নতুন তারিখ ৩১ অক্টোবর ৩৫০ বছর আগে বিলুপ্ত ডোডো পাখি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছেন বিজ্ঞানীরা! ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বাড়তি বেতন, তবে পাচ্ছেন না সবাই ভুয়া বিলের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকের মামলা ১৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে পীরগঞ্জে তিন হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে চলে গেলেন চিকিৎসক আঁচল

  • সবশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮৩ জন সংবাদটি দেখেছেন
সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে চলে গেলেন চিকিৎসক আঁচল
সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে চলে গেলেন চিকিৎসক আঁচল

ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনেছিলেন দুজনে মিলে। ঢাকার খিলগাঁওয়ে আঁচল রায়ের মা-বাবার বাসার পাশেই ছোট একটি বাসাও ভাড়া নিয়েছিলেন। পরিকল্পনা ছিল ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেবেন। এরপর বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করবেন চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়।

কিন্তু সেই সংসার আর গুছিয়ে নেওয়া হলো না আঁচলের। বিয়ের প্রায় দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি।

তাঁকে বাঁচাতে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। চিকিৎসক স্বামী বিপ্লবও পাশে থেকে স্ত্রীর চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বিয়ের ছবি-ভিডিও, স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রভ্রমণের ছবি এবং পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকে রয়ে গেছে। আর খিলগাঁওয়ের সেই বাসায় পড়ে আছে নতুন সংসারের জন্য কেনা জিনিসপত্র ও দুজনের একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

বিয়ের পরও দুই শহরে জীবন

গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় বিপ্লব ও আঁচলের বিয়ে হয়। তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। দুজনই চিকিৎসক হওয়ায় চাকরি ও পেশাগত দায়িত্বের কারণে বিয়ের পরও নিয়মিত একসঙ্গে থাকা হয়ে ওঠেনি।

একসময় আঁচল কর্মরত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, আর বিপ্লব জামালপুরে। পরে একজন ঢাকায় এবং অন্যজন বরগুনায় কর্মরত ছিলেন।

ছুটি পেলে কিংবা কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় এলে দেখা হতো তাঁদের। সেই সময়েই চলত সংসারের পরিকল্পনা—কী কিনবেন, কোথায় থাকবেন এবং কবে থেকে স্থায়ীভাবে একসঙ্গে সংসার শুরু করবেন।

খিলগাঁওয়ে আঁচলের মা-বাবার বাসার পাশে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও কিনেছিলেন তাঁরা।

সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা করেন এই দম্পতি। বরিশালে বিপ্লবের বাড়ির কাছাকাছি পোস্টিং নিয়ে সেখানে সংসার শুরু করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। সংসার গুছিয়ে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।

বর্তমানে বিপ্লব জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বরগুনার বেতাগী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত।

স্ত্রীকে হারিয়ে বিপ্লবের আক্ষেপ, ডেঙ্গু তাঁদের সংসারটি গুছিয়ে নেওয়ার সময়ও দিল না।

২১ সেপ্টেম্বর শুরু হয় জ্বর

আঁচলের জ্বর আসে ২১ সেপ্টেম্বর। সেদিন জ্বর নিয়েই স্বামীর সঙ্গে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন তিনি। পরে বাসায় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হলে তাঁর প্লাটিলেটের মাত্রা ছিল এক লাখ।

বিপ্লব তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেও আঁচল তখন রাজি হননি। অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে যাবেন বলে জানিয়েছিলেন।

পরবর্তী কয়েক দিনে তাঁর প্লাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে। তা ২৫ হাজারে নেমে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এরপর আঁচলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে তাঁকে এইচডিইউ এবং পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়।

বিপ্লব জানান, আঁচল চিকিৎসার নিয়ম মেনে চলতেন এবং চিকিৎসক হিসেবে নিজের শারীরিক অবস্থাও বুঝতেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে একাধিক জটিল চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

চিকিৎসকদের পাশাপাশি স্ত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টায় নিজেও যুক্ত ছিলেন বিপ্লব। একজন চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসার বাস্তবতা বুঝলেও স্বামী হিসেবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় ছিলেন তিনি।

আইসিইউতে স্ত্রীকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল।

পড়াশোনা ও চিকিৎসাই ছিল আঁচলের ধ্যানজ্ঞান

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে বিপ্লব ও আঁচলের পরিচয়। বিপ্লব ছিলেন পঞ্চম ব্যাচের এবং আঁচল সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসার কথা জানান। পরে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়।

স্বামীর ভাষ্য অনুযায়ী, আঁচল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনায় মনোযোগী চিকিৎসক। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করেন।

মৃত্যুর আগে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আঁচল।

স্ত্রীর পেশাগত দক্ষতা নিয়ে গর্ব করতেন বিপ্লব। তিনি বলেন, নিজে চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে আঁচলের মতামত নিতেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধেও তাঁরা সচেতন ছিলেন। বাসায় মশারি ব্যবহারসহ মশার কামড় থেকে বাঁচতে সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তবে কোথা থেকে আঁচল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যে ছবিটি দেখে যেতে পারলেন না আঁচল

আঁচলের মৃত্যুর পর ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁদের দুজনের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন বিপ্লব। ছবিতে বিপ্লব যে পাঞ্জাবি পরেছিলেন, সেটি ছিল আঁচলের দেওয়া। আর আঁচলের শাড়িটি দিয়েছিলেন বিপ্লবের ছোট বোন।

ছবিটি অনেক আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে আঁচলের অভিমানও ছিল।

স্ত্রী বেঁচে থাকতে ছবিটি আর পোস্ট করা হয়নি।

ছবিটি প্রকাশ করে বিপ্লব লিখেছেন, ‘ছবিটা আপলোড দিতে এতটা দেরি হবে বুঝতে পারি নাই।’

আঁচলের চাওয়া সেই সাদা ফুল

বিপ্লব জানান, আঁচল মাঝেমধ্যে মজা করে বলতেন—তিনি যদি স্বামীর আগে মারা যান, তাহলে তাঁর সমাধিতে যেন সাদা ফুল নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই কথাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিল।

বিপ্লব বলেন, ‘আগে মাঝেমধ্যে আঁচল মজা করে বলত, সে আমার আগে মারা গেলে তার সমাধিতে যেন সাদা ফুল নিয়ে যাই। ওর কথামতো আমি সাদা গোলাপ নিয়ে গেলাম…।’

একসঙ্গে সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখা দুজন মানুষের একজন এখন শুধুই স্মৃতি। অন্যজনের সামনে পড়ে আছে তাঁদের অসমাপ্ত সংসার, নতুন কেনা জিনিসপত্র আর একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

 

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আরএনবি নিউজ ২০২৫-২৫
Theme Download From ThemesBazar.Com