একসময় ভোর হলেই নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামতেন জেলেরা। জাল ফেললেই উঠত টেংরা, বোয়াল, পাবদা, শিং, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। সেই মাছ বিক্রির আয়েই চলত সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা। তবে সময়ের সঙ্গে তিস্তায় মাছ কমে যাওয়ায় বদলে গেছে নদীপাড়ের জেলেদের জীবন।
এখন সারাদিন জাল ফেলেও অনেক সময় এক কেজি মাছও মেলে না। নদীতে যাওয়ার খরচই উঠে আসে না অনেকের। ফলে পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দিনমজুরি, কৃষিশ্রমিক, ইটভাটা কিংবা অটোরিকশা চালানোর মতো কাজে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা।
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭টি। এর মধ্যে তিস্তা তীরবর্তী বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও নাজিমখান ইউনিয়নের ৬৮৬টি জেলে পরিবার সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ১৭৫টি, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় ৩৮০টি এবং নাজিমখানে ১৩১টি জেলে পরিবার রয়েছে।
জেলেরা জানান, আগের মতো মাছ না পাওয়ায় নদীতে যাওয়ার খরচও উঠছে না। নৌকার জ্বালানি, জাল মেরামত ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলে হাতে থাকে সামান্য টাকা। তাই অনেকেই নদীতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন।
কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কেউ আবার ইটভাটায়, অটোরিকশা চালিয়ে কিংবা অন্যের পুকুরে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছেন।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাড়ামৌলা এলাকার জেলে আব্দুল জলিল বলেন, “নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। আগে মাছ ধরেই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। কখনো আবার ঢাকায় গিয়ে কাজ করে সংসার চালাতে হয়।”
একই ইউনিয়নের তৈয়বখাঁ মৌজার জেলে বিজয় বলেন, নদীতে পর্যাপ্ত মাছ না থাকায় মাঝেমধ্যে পুকুরের মাছ ধরার কাজ পান। সেখান থেকে সামান্য কিছু আয় হলেও তা দিয়ে সংসারের খরচ ঠিকমতো চলে না।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের এক জেলে বলেন, “পেশা বদল করেছি ঠিকই, কিন্তু সারা বছর কাজ থাকে না। আয় কমে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।”
জেলেদের ভাষ্য, তিস্তায় বালু-পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে গেছে। বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় পানির প্রবাহ ও মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বড় অংশ বালুচরে পরিণত হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে।
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেন, নদী দূষণ, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও পরিবেশ কমে যাচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদনও কমছে। এর প্রভাব সরাসরি জেলেদের ওপর পড়ছে। আগের তুলনায় তাদের জালে মাছ কম ধরা পড়ছে।
মাছ কমে যাওয়ায় শুধু জেলেদের আয়-রোজগারই কমেনি, সংকটে পড়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নদীনির্ভর এই পেশাও। জেলেদের দাবি, তিস্তায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নদীনির্ভর পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।
তা না হলে মাছের সংকটের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে তিস্তাপাড়ের বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের পেশা ও জীবিকার পথ।