দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অনিয়মের অভিযোগে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্রের দাবি, অপরাধ বা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের কথাও জানানো হয়েছে। তবে যুবদল উত্তর মহানগর কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা জানিয়েছে। ছাত্রদলও পশ্চিম মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশাপাশি দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকেও বিতর্কিত নেতাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।
সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তাধীন। কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকেও সতর্ক করা হয়েছে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে দলের ভেতরে।
সরকার ও বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন এমপি, মন্ত্রী ও দলীয় নেতাকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এলাকায় দখলদারি, প্রভাব বিস্তার ও দলীয় কোন্দলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অন্তত চারজন প্রতিমন্ত্রীর কাছে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
দলীয় সূত্রের দাবি, ওই ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিএনপির বিতর্কিত নেতাদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে দলীয় সূত্রের বরাতে আরও বলা হয়েছে, বুধবার ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ মহানগরের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। ওই বৈঠকে মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি। পাশাপাশি অন্য প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, দলের কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের হিসাবে, সরকার গঠনের পর থেকে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের এক হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, অব্যাহতি এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জমি বা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং সালিশ-দরবারের নামে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা আমলে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ইতোমধ্যে জমা পড়া কিংবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দলীয় পরিচয় বা প্রভাবের চেয়ে আইনের প্রয়োগকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিতে চায় বিএনপি। ভবিষ্যতে কেউ অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তিনি সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় মেজর (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে আটকের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, প্রভাবশালী হলেও আইনের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ নেই। খবর যুগান্তর অনলাইন।