বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থি রাজনীতির ইতিহাসে মোফাখখার চৌধুরী একটি আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) একটি অংশের শীর্ষ নেতা ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ সময় সংগঠন পরিচালনা করেছেন তিনি। অনুসারীদের কাছে তিনি ‘শহীদ হোসেন’ ও ‘মাস্টার প্রভাকর’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার নিজামপুর গ্রামের সন্তান মোফাখখার চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বামপন্থি ও চরমপন্থি রাজনৈতিক ধারায় সক্রিয় হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন।
সত্তরের দশকে চরমপন্থি রাজনীতির বিভিন্ন ধারার বিভক্তি ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) নেতৃত্বে উঠে আসেন। আদর্শগত মতপার্থক্য, সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের বিরোধের কারণে একাধিকবার দল ভাঙন ও পুনর্গঠনের ঘটনাও ঘটে তার রাজনৈতিক জীবনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোফাখখার চৌধুরী একদিকে বামপন্থি রাজনীতির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, অন্যদিকে তার নেতৃত্বাধীন সংগঠনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সহিংস কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগও ছিল।
১৯৯৯ সালে সরকার চরমপন্থি গ্রুপগুলোর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সশস্ত্র তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পরবর্তীতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনের পর চরমপন্থি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মোফাখখার চৌধুরীকে আটক করা হয়। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় র্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনি নিহত হন।
তবে তার মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। মোফাখখারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মৃত্যুর পর তার মরদেহ কুষ্টিয়া মর্গে রাখা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে প্রকাশ্যে মরদেহ গ্রহণে অনীহা দেখালেও পরে গোপনে মরদেহ নিয়ে নিজ গ্রামে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন তার বাড়িতে পুলিশি নজরদারিও ছিল।
মোফাখখার চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে দলের বিভিন্ন অংশ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ধারাবাহিক অভিযান, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব সংকটে সংগঠনটির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বাংলাদেশের চরমপন্থি রাজনীতির ইতিহাসে মোফাখখার চৌধুরী তাই একদিকে আদর্শিক রাজনীতির আলোচিত চরিত্র, অন্যদিকে সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় অভিযান ও বিতর্কিত মৃত্যুর কারণে বহুল আলোচিত এক নাম হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।