বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌযানের অবস্থান শনাক্ত, সমুদ্রে চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। এ জন্য মহাকাশে কম উচ্চতায় চারটি স্যাটেলাইট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী নৌযানের অবস্থান, গতি ও গতিপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করছে বিএসসিএল।
বিএসসিএলের প্রস্তাব অনুযায়ী, সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার জন্য চারটি স্যাটেলাইট, দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য দেশের অভ্যন্তরে সার্ভার অবকাঠামো স্থাপন করা হবে।
এ ব্যবস্থায় বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট কোনো এলাকা সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পরপর পুনরায় পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে একে ‘রিভিজিট টাইম’ বলা হয়।
প্রচলিত এআইএস ব্যবস্থায় উপকূলীয় রেডিও অবকাঠামোর মাধ্যমে নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যবস্থায় সমুদ্রের দূরবর্তী এলাকায় থাকা নৌযানের সংকেতও গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
তবে এআইএস যন্ত্র স্থাপন করা নেই কিংবা সংকেত বন্ধ রাখা হয়েছে—এমন নৌযান শনাক্তের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকবে।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় মৎস্য আহরণ, নৌযান চলাচল, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহার এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়। সেটি মূলত যোগাযোগ ও সম্প্রচারের কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে নতুন প্রস্তাবিত স্যাটেলাইটগুলোর কাজ হবে সমুদ্রে চলাচলকারী নৌযানের সংকেত শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা।
বিএসসিএল জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হলে জাতীয় পর্যায়ে সামুদ্রিক তথ্যের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানিয়েছেন, অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এরপর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত করে স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে হবে।
চলতি বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়, দুর্যোগ কিংবা দিক হারিয়ে অনেক সময় বিপদে পড়েন জেলেরা। কখনো ট্রলারডুবি ঘটে, আবার কখনো স্রোতের টানে নৌযান ভিনদেশের জলসীমায় চলে যায়।
ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ অ্যাকটিভিটি বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় এলাকার ৫০ লাখের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ।
অন্যদিকে লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের ‘ফিশসেফ’ ২০২৫ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ হাজার ৩৫০ জনের বেশি জেলে সমুদ্রে প্রাণ হারান।
প্রস্তাবিত স্যাটেলাইট ব্যবস্থা নৌযানের অবস্থান পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। তবে জরুরি যোগাযোগ ও উদ্ধার কার্যক্রমে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নৌযানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি মাছ ধরার নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে নির্দিষ্ট গভীরতার বাইরে মাছ ধরার নিয়ম থাকলেও কিছু নৌযান তা অনুসরণ করে না। নৌযানের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও চেকপোস্টের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা গেলে আইন প্রয়োগে সুবিধা হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে প্রায় ৩০ হাজার নিবন্ধিত ক্ষুদ্র মাছ ধরার নৌকা রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ৭০ হাজার অনিবন্ধিত নৌকা থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।
তবে অনিবন্ধিত নৌকা মানেই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হবে, এমন নয়। এআইএস সংকেত না পাঠানো নৌযান শনাক্ত করতে বাড়তি প্রযুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।
বিএসসিএলের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নৌযানের অবস্থান ও গতিপথের তথ্য ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে যাত্রা পরিচালনা করা গেলে জ্বালানি খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে।
সংস্থাটির হিসাবে, একটি নৌকা একবারের যাত্রায় সর্বোচ্চ ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সাশ্রয় করতে পারে।
এই হিসাবে বছরে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য ৪৫৯ কোটি টাকা।
তবে এটি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রাক্কলন। বাস্তবে কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক ও স্যাটেলাইট বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান মনে করেন, শুধু এআইএস প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলে সমুদ্রে সব নৌযান শনাক্ত করা সম্ভব হবে না।
তাঁর মতে, এআইএসের পাশাপাশি সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার (এসএআর) প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে এআইএস সংকেত না পাঠানো নৌযানও শনাক্ত করা সম্ভব।
একই সঙ্গে চারটি স্যাটেলাইট দিয়ে প্রয়োজনীয় সমুদ্র এলাকায় কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে কি না, তা বিস্তারিতভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের ব্যয় ও সম্ভাব্য সুফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে একই ধরনের সেবা নেওয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হবে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বঙ্গোপসাগরে নজরদারি বাড়াতে প্রস্তাবিত এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নৌযানের অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বাস্তবায়ন ব্যয়, পরিচালন খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন।
বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হওয়ার পরই স্যাটেলাইট নির্মাণ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।