আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনার বর্ণনায় আবারও পরিবর্তন আনছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন বর্ণনায় স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এবার বিএনপি সরকারের সময়ে সেই বর্ণনায় নতুন পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিমার্জন শেষে বই ছাপার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কিছু বই ছাপাও হয়েছে।
২০২৭ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’।
এ অধ্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। ওই রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণের সংবাদ তারবার্তার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। একই রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন বলে নতুন পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বইয়ের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতের ঘটনাপ্রবাহের পর ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে জিয়াউর রহমান বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একত্র করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর কথা জানান।
এ ছাড়া ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে নতুন পাঠ্যবইয়ের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে বইটিতে তুলে ধরা হচ্ছে।
নতুন পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে এবং ওই রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করা হয়।
এরপর ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বলে ওই বইয়ে উল্লেখ করা হয়।
পাশাপাশি ২৭ মার্চ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে বর্ণনা করা হয়।
অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার বিষয়টি থাকলেও ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বর্ণনায় তাঁর বিদ্রোহ, সামরিক নেতৃত্ব এবং ঘোষণার সময় ও পরিস্থিতি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকাশিত ২০২২ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে ভিন্ন বর্ণনা ছিল।
ওই পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের আগে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বলে ওই বইয়ে উল্লেখ করা হয়।
এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছিল।
ফলে আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
শুধু স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনাই নয়, আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরও কিছু বিষয় নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা।
এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণির নতুন বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’।
অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা, কারিগরি জ্ঞান ও আনন্দময় শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব বই যুক্ত করা হচ্ছে বলে পাঠ্যবই পরিবর্তনের পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সরকারের সময়ে পাঠ্যবইয়ের বর্ণনায় পরিবর্তন এসেছে।
এতে একেক শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা একই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গবেষক আফসান চৌধুরী প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস পরিবর্তনের প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রের ইতিহাস রচনায় রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাব রয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির চর্চা বেশি গুরুত্ব পায়।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাশাপাশি সমাজের ইতিহাস ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার নতুন বর্ণনা যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষায় ধারাবাহিকতা, ঐতিহাসিক দলিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন।