দেশে অবৈধভাবে আমদানি করা মুঠোফোন বন্ধে তৃতীয়বারের মতো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) পুরোপুরি চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বৈধ মুঠোফোনের দাম না কমিয়ে অবৈধ সেট বন্ধের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে চায় না সরকার।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এনইআইআর বাস্তবায়নের আগে বৈধ ও অবৈধ ফোনের দামের ব্যবধান কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মুঠোফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর হলো মুঠোফোন শনাক্তকরণের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রতিটি ফোনের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর যাচাই করা যায়।
এর ফলে বৈধভাবে উৎপাদিত বা আমদানি করা ফোন শনাক্ত করার পাশাপাশি অবৈধ, চুরি হওয়া কিংবা অননুমোদিত সেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বিটিআরসি কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে বৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা মুঠোফোন শনাক্ত করা হবে।
এই ধাপে ফোনের নিবন্ধন বাতিল বা ডি-রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা থাকবে না।
পরবর্তী ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ফোনের প্রকৃত বা সর্বশেষ মালিকের তথ্যের সঙ্গে সেটের ব্যবহার সমন্বয় করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিটিআরসির নথিপত্র অনুযায়ী, অবৈধ মুঠোফোন নিয়ন্ত্রণে ২০২১ সালের ১ জুলাই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে এনইআইআর চালু করা হয়।
তবে তখন অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে ব্যবহার রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলো পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি।
পরে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে এনইআইআর পুরোপুরি চালুর উদ্যোগ নিতে বলে। চিঠিতে অবৈধ ফোনের কারণে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ বিষয়ে অনুমোদন দেয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সভায়ও ব্যবস্থা পুরোপুরি চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
বিটিআরসি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি সব সুবিধাসহ এনইআইআর চালুর প্রস্তুতি নিলেও মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের পর অবৈধ ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধের ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়নি।
সর্বশেষ চলতি বছরের ৯ জুন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে এনইআইআর পুরোপুরি চালুর বিষয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয়।
এরপর ২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
সর্বশেষ সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে এনইআইআর চালুর প্রস্তাব করা হয়।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, এনইআইআর চালু নিয়ে সরকার সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
কারণ মুঠোফোন ব্যবসার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ও ক্রেতা যুক্ত রয়েছেন। অবৈধ সেট বন্ধের ফলে তাঁদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে অবৈধ মুঠোফোন বন্ধ করা প্রয়োজন।
তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করতে হবে।
তাঁর মতে, কম দামে বৈধ মুঠোফোন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এনইআইআর পুরোপুরি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
চলতি বছরের শুরুতে বৈধভাবে আমদানি করা মুঠোফোনের দাম কমানোর উদ্দেশ্যে সরকার শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের লক্ষ্য ছিল, বৈধ ও অবৈধ সেটের দামের পার্থক্য কমিয়ে ক্রেতাদের অফিশিয়াল ফোন কিনতে উৎসাহিত করা।
তবে বাজারে প্রত্যাশিত দাম কমার পরিবর্তে অনেক মডেলের দাম বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক কমানোর আগেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফোনের দাম ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
চলতি বছরের শুরুতে যে ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন প্রায় ১৩ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, সেপ্টেম্বর নাগাদ সেটির দাম বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের তথ্য থেকে জানা গেছে।
এমনকি বছরের শেষ নাগাদ সর্বনিম্ন দামের স্মার্টফোনের দাম ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কিছু উৎপাদক।
তবে এটি বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নিশ্চিত মূল্য পূর্বাভাস নয়।
এক্সেল টেলিকমের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন টিপুর মতে, বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মেমোরি চিপ উৎপাদন করায় প্রয়োজন অনুযায়ী চিপ সংগ্রহ করতে গিয়ে উৎপাদনকারীদের বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
ফলে মুঠোফোন উৎপাদন ও সংযোজন ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারমূল্যে।
দেশে গত এক দশকে মুঠোফোন উৎপাদন ও সংযোজনশিল্প গড়ে উঠলেও স্থানীয় কারখানাগুলো প্রধানত নিম্ন ও মধ্যম দামের ফোন উৎপাদন ও সংযোজন করে।
অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অনেক প্রিমিয়াম মডেল দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা কঠিন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশের বাজারে সাধারণত দুই ধরনের মুঠোফোন বিক্রি হয়—অফিশিয়াল ও আনঅফিশিয়াল।
অফিশিয়াল ফোন বৈধ আমদানি বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারে আসে। অন্যদিকে আনঅফিশিয়াল ফোনের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক ক্রেতা সেদিকে ঝুঁকছেন।
বৈধ মুঠোফোন উৎপাদকদের দাবি, বাজারে বিক্রি হওয়া আনঅফিশিয়াল ফোনের একটি বড় অংশ রিফার্বিশড বা আগে ব্যবহৃত।
তাঁদের দাবি অনুযায়ী, এসব ফোনের ব্যবহারকাল ও মান নিয়ে ক্রেতারা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তবে আনঅফিশিয়াল ফোনের কত শতাংশ রিফার্বিশড বা ব্যবহৃত, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এনইআইআর কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বৈধ মুঠোফোনের দাম রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, বিভিন্ন দেশে শুল্ক কমিয়ে মুঠোফোনের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরা, ডিসপ্লে প্যানেল, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমানো গেলে দেশে সংযোজিত ফোনের উৎপাদন খরচ কমতে পারে।
তাঁর মতে, বৈধ ফোনের দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আনঅফিশিয়াল সেটের বিক্রি নিরুৎসাহিত করা এবং এনইআইআর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর নতুনভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব অবৈধ ফোন ওই দিন থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রথম ধাপে বৈধ সেট শনাক্ত এবং পরবর্তী ধাপে নিবন্ধনসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে বৈধ মুঠোফোনের দাম কমানোর বিষয়ে আলোচনা চললেও বাজারে কবে এবং কতটা দাম কমবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ফলে নতুন ফোন কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বৈধতা, আইএমইআই নম্বর, বিক্রয় রসিদ ও ওয়ারেন্টির বিষয়গুলো যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে অবৈধ ফোন বন্ধে সরকারের উদ্যোগ এগোলেও বৈধ সেটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্