বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হামের প্রাদুর্ভাব। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং দুর্গম এলাকার শিশুদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে না পারায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় টিকাদানের হার বজায় রাখতে না পারার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশ তার একটি বড় উদাহরণ।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার মানুষের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হাম-সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেশি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ডব্লিউএইচওর নথিপত্র, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এই সংকটের বিভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে প্রয়োজনীয় টিকার আওতায় রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ একসময় এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ছিল ৯৩ শতাংশ।
কিন্তু ২০২৫ সালে প্রথম ডোজের হার কমে ৯০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের এই ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পরও অল্পসংখ্যক শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয় না। এ কারণে দ্বিতীয় ডোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে।
ওই সময়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, টিকা কেনার আদেশ দিতে বিলম্ব এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়।
এর প্রভাব পরবর্তী বছরেও পড়ে।
এ ছাড়া টিকাদান কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টিকাদানসংক্রান্ত সরকারি তথ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে টিকাদানের হার লক্ষ্যমাত্রার ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়েছিল। এতে লক্ষ্যভুক্ত শিশু বা দেওয়া টিকার ডোজ গণনায় অসংগতি থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি কর্মসূচির আওতায় প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যভুক্ত সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণেই বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।
জুন মাসে একই বয়সসীমার শিশুদের নিয়ে পরিচালিত অন্য একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচির তালিকায় হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর নাম পাওয়া যায়।
এতে হামের টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সামনে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে জানান, টিকাদানের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিভাবকদের অনীহা কিংবা শিশুর অসুস্থতার কারণেও অনেকে কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা সরকারি ও স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থাগুলোর বৈঠকের নথিপত্রে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির প্রস্তুতিতে ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে।
১৯ এপ্রিলের বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সময়ের স্বল্পতার কারণে কর্মসূচি শুরুর আগে প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এসব প্রস্তুতির মধ্যে টিকা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণব্যবস্থা, লক্ষ্যভুক্ত শিশুর সংখ্যা এবং মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে।
ওই এক দফা যাচাইয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত থাকলেও সব জেলা প্রস্তুত ছিল না।
বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, প্রস্তুতি যাচাইয়ে ঘাটতি থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরা।
হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি সিলেট অঞ্চল।
সিলেটের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের দুই বছর বয়সী শিশু আরমান হোসেন গত জুলাইয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তাকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি।
আরমানের বাবা আমিন মিয়া সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করেছিলেন।
হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আরমানের মৃত্যু হয়।
তার চার বছর বয়সী বোনও টিকা না নেওয়া অবস্থায় হামে আক্রান্ত হয়েছিল। তবে সে সুস্থ হয়ে ওঠে।
আমিন মিয়ার অভিযোগ, ছেলেকে দাফনের পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের এলাকায় আসেন।
অন্যদিকে সিলেটের ছাতকে নয় মাস বয়সী শিশু লাবিবা আক্তার গত জুনে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
লাবিবার বাবা হুমায়ুন রশিদের অভিযোগ, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির খবর জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী তাঁদের কাছে যাননি।
যদিও এপ্রিল মাসে জরুরি কর্মসূচির আওতায় টিকা দেওয়ার বয়সসীমা নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিলেটে সরকারি হিসাবে হামে ১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে সংস্থাটির সাক্ষাৎকার নেওয়া ১৬টি পরিবারের মধ্যে আটটি পরিবার জানিয়েছে, তারা টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে এলাকায় আসতে দেখেনি।
অন্তত ছয়টি পরিবার জানিয়েছে, তাদের এলাকায় কোনো শিশু হামে মারা যাওয়ার পর স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গিয়েছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে প্রতি এক হাজার হামের রোগীর মধ্যে দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে। তবে অপুষ্টি ও পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করলেই হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
প্রকৃতপক্ষে কত শিশু টিকা পেয়েছে, কারা বাদ পড়েছে এবং কোন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে জানা জরুরি।
আগস্টের বৈঠকের নথি অনুযায়ী, পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়া শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়া শিশুর হার জরুরি কর্মসূচির আগে ছিল ৮২ শতাংশ। কর্মসূচির পর তা ৮৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
এতে বোঝা যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়ার সমস্যা তখনো ব্যাপকভাবে রয়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকা না দিলে প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
দেশে টিকাদান কার্যক্রমের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিশুদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ।
ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শিশুর জন্মনিবন্ধন না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ খালি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে দুর্গম ও দরিদ্র এলাকার সব শিশুকে শনাক্ত করা এবং নিয়মিত টিকার আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আগে টিকাদান থেকে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, কোনো শিশু যাতে টিকাদানের বাইরে না থাকে, সে জন্য গ্রামপর্যায়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু নয়, প্রয়োজনে এর বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদানের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশু।
বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর উপপ্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল জানিয়েছেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা দিতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটতি তৈরি না হয়।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
তাঁর মতে, রোগের প্রাদুর্ভাব শুরুর আগেই নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার তুলনায় সহজ, নিরাপদ ও কম ব্যয়বহুল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জরুরি হলো নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা এবং প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিটি শিশুর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
তথ্যসূত্র: রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের তথ্য অবলম্বনে।