সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তারের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেছেন, শামীমকে হত্যার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। একই সঙ্গে এ ঘটনায় অনুতপ্ত নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৬-এর সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে তাঁকে সাতক্ষীরা সদর থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ তাঁকে আদালতে পাঠায়।
থানায় হস্তান্তরের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক আমিনী বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী।’ তবে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না দাবি করে তিনি ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।
শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় অনুতপ্ত কি না—এমন প্রশ্নে আমিনী বলেন, ‘না, এজন্য আমি অনুতপ্ত নই।’ পাশাপাশি নিহত ব্যক্তির ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে নিজের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত দাবি; এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, ফজলুল হক আমিনী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে চান বলে জানিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে পুলিশ।
যেভাবে ঘটে শামীমের মৃত্যু
গত মঙ্গলবার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) মারধর করা হয়। তিনি দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
নিহতের বড় ভাই আবদুল জলিল গত বৃহস্পতিবার রাতে হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে (৪৫) প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার ভোরে এজাহারভুক্ত পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ওসি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
হাসপাতালেও মারধরের অভিযোগ
নিহত শামীমের পরিবারের ভাষ্য, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার তাঁর ও স্ত্রীর মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয় এবং স্থানীয় একটি বাজারে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে তিনি বিষপান করেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. সবুরের চেম্বারে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। পরদিন শতাধিক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করেন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ভর্তি করার পর শতাধিক ব্যক্তি ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে আবার মারধর করেন। আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও হাসপাতালের কর্মীরা তাঁদের থামাতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের কয়েকটি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি। পুলিশ এখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ফুটেজ চায়নি; চাইলে তা দেওয়া সম্ভব হবে।
এসআরবি-৬-এর সিপিসি-১, সাতক্ষীরার কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জায়েন উদ্দীন মুহাম্মদ যিয়াদ জানান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মামলাটির তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঘটনার প্রকৃত দায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারিত হবে।