দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্মাণকাজ, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং অসহনীয় যানজটের পর অবশেষে গাজীপুরের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ যে বিশেষ বাসসেবা চালুর উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই বাস আর চালুই হয়নি।
এখন বিআরটির জন্য নির্মিত স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে বিদ্যমান সড়ককে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রোববার (১৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি পত্রে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ভেঙে ফেলা হবে বিআরটি স্টেশন ও লেন বিভাজক
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডরের স্টেশন ও সড়ক বিভাজক অপসারণ করা হবে।
এরপর বিদ্যমান সড়ককে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ক ভবিষ্যতে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থায়নকারী উন্নয়নসহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে।
চারটি বিকল্পের মধ্যে বাতিলের সিদ্ধান্ত
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি বিকল্প আলোচনা করা হয়।
প্রথম বিকল্প ছিল প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করা।
দ্বিতীয় বিকল্পে অসমাপ্ত নির্মাণকাজ শেষ করে বিশেষ বিআরটি বাস কিনে চলাচল শুরু করার প্রস্তাব ছিল।
তৃতীয় বিকল্পে বিদ্যমান অবকাঠামো রেখে বিশেষ বাসের পাশাপাশি বেসরকারি বাস চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়।
আর চতুর্থ বিকল্প ছিল বিআরটি করিডরকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা।
সব দিক বিবেচনার পর সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
২ হাজার ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি
২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প গ্রহণ করে।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মধ্যে ১৫ দশমিক ০৭ কিলোমিটার ছিল সমতল সড়ক। বাকি অংশে উড়ালপথ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
সড়কের মাঝখানে পৃথক দুটি লেনে বিশেষ বাস চলাচলের ব্যবস্থা করার কথা ছিল।
প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে প্রাথমিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছিল।
প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সালে বিশেষ বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তিন দফা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ইতোমধ্যে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি করার প্রস্তাবও ছিল
২০২৫ সালে প্রকল্পটি চতুর্থবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সেই প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
বরং প্রকল্পটির বিকল্প ব্যবহার খুঁজে বের করা এবং পরিকল্পনা ও নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা বাতিলের সুপারিশ করেছিলেন
বিআরটি প্রকল্পের কারিগরি ও বাস্তবায়নগত সমস্যা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল।
দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক।
বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে পদ্ধতিগত ব্যর্থতার একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে যথাযথ কারিগরি যাচাইয়ের অভাব, নকশাগত ত্রুটি, দক্ষ জনবলের সংকট এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয় তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেন।
অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, প্রকল্পটির সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে বাতিল করাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত।
তবে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে দুর্ভোগ পোহানো যাত্রীদের জন্য বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
গাজীপুর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ট্রেন চালুর পরামর্শ
অধ্যাপক সামছুল হক গাজীপুরবাসীর জন্য কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেনসেবা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, গাজীপুর থেকে বিআরটি বাসে বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে যাত্রীদের আবার অন্য পরিবহনে উঠতে হতো।
এতে সরাসরি যাতায়াতের সুবিধা পাওয়া যেত না।
অন্যদিকে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় কমিউটার ট্রেনসেবা চালুর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৯৭ শতাংশ কাজ শেষে বাতিলের বিরোধিতা
তবে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’ নামে একটি সংগঠন।
সংগঠনটির সভাপতি মো. শামসুল হক জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর এটি বাতিল করা ঠিক হবে না।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন দুর্ভোগ সহ্য করার পর গাজীপুরবাসীর বিআরটি বাসসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সও (বিআইপি) প্রকল্প বাতিলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
সংস্থাটির একটি হিসাবে বলা হয়, প্রকল্প বাতিলের পর বিভিন্ন অবকাঠামো অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ বাবদ এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
তবে এটি একটি পূর্ববর্তী হিসাব; প্রকল্প বাতিলের চূড়ান্ত অতিরিক্ত ব্যয় এখনো নিশ্চিত নয়।
১৫টি স্টেশন, অনেক অবকাঠামো অসমাপ্ত
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডরে ১৫টি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
কিন্তু কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত পদচারী-সেতুর কয়েকটিতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট বসানো হলেও সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে কংক্রিটের বিভাজক ও লোহার বেড়া বসানো হয়েছে।
ফলে অনেক স্থানে যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে যানজট আরও বেড়েছে।
নির্মাণকাজের সময় প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন
প্রকল্পের দীর্ঘ নির্মাণকাজ চলাকালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে সাধারণ যাত্রীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেনসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানির তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
শুরু থেকেই ছিল পরিকল্পনাগত সমস্যা
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই বিআরটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল।
নির্মাণকাজ শুরুর পর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার ঘাটতি, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তরের জটিলতা এবং যানবাহন চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার মতো সমস্যা সামনে আসে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর যুক্ত ছিল।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পর্যালোচনা করে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।
বিপুল ব্যয়ের পরও প্রশ্নের মুখে প্রকল্প
১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চালিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরও বিশেষ বাসসেবা চালু করতে না পারায় প্রকল্পটির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিআরটি অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক তৈরি করা হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কতটা কমবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
একই সঙ্গে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার কার্যকারিতা, অব্যবহৃত অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ এবং প্রকল্পের ত্রুটির জন্য জবাবদিহির বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।