১৫ দিন আগেও আমার মেয়ে ফোন করে বলেছিল, দুই মাস পর বাড়ি ফিরবে। এখন শুনছি, সৌদি আরবে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু কেউ আমাদের নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি। আমার মেয়ে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে—আমি জানতে চাই। জীবিত হোক কিংবা মৃত, আমি আমার মেয়েকে ফেরত চাই।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবপ্রবাসী সুইটি আক্তারের মা জহুরা বেগম।
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেরা ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামের সুইটির পরিবারের।
পরিবারের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
সুইটির মা জহুরা বেগম জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে মেয়ের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই।
সর্বশেষ প্রায় ১৫ দিন আগে ফোন করে সুইটি জানিয়েছিলেন, আরও দুই মাস পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরতে পারবেন।
সেই আশাতেই মেয়ের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
কিন্তু হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তাঁদের সব আশা অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।
জহুরা বেগম বলেন, তাঁর মেয়ের প্রকৃত অবস্থা কী, সেটি তাঁরা জানতে চান। বাংলাদেশ সরকারের কাছে মেয়ের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দাবি করেন তিনি।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া পেশায় দিনমজুর। তাঁর পাঁচ মেয়ের মধ্যে সুইটি সবার ছোট।
প্রায় ছয় বছর আগে সুইটির বিয়ে হয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় চার বছর আগে তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।
ফজল মিয়া জানান, একজন দালালের মাধ্যমে মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে প্রায় দেড় লাখ টাকা ধার করতে হয়েছিল।
সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম পাঁচ মাস বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছিলেন সুইটি।
কিন্তু কিছুদিন পর ফোন করে জানান, তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে।
সুইটির বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কায় কর্মরত অন্য কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে ঝগড়ার পর সুইটিকে একটি ঘটনায় ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি পরিবারকে জানিয়েছিলেন।
তবে সুইটির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, বিচারিক প্রক্রিয়ায় কী ঘটেছিল কিংবা আদালতের রায় কী ছিল—এসব বিষয়ে পরিবারের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।
ফজল মিয়া জানান, কারাগারে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর প্রায় এক বছর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তাঁরা।
পরে বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ হলেও মামলার বিচার বা সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে সুইটি পরিবারকে কিছু জানাননি বলে দাবি করেন তিনি।
সুইটির বাবা বলেন, কয়েক দিন আগে অন্যদের মাধ্যমে জানতে পারেন, সৌদি আরবে তাঁর মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
কিন্তু এ বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পাননি তাঁরা।
ফজল মিয়ার ভাষ্য, মেয়ের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে, তা এখনো তাঁদের অজানা।
মঙ্গলবার সকালে সুইটির বাড়িতে গিয়ে প্রতিবেশীদের ভিড় দেখা যায়। তাঁরাও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছিলেন।
মেয়ের খবরে উদ্বিগ্ন বাবা অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে ছিলেন। অন্যদিকে মা জহুরা বেগম মেয়ের ফেরার আশায় অপেক্ষা করছেন।
মহেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর এবং মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, সুইটির বিষয়ে সরকারের কোনো পর্যায় থেকে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
ফলে স্থানীয় পর্যায়েও তাঁর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুইটির পরিবারের দাবি, সৌদি আরবে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের জানাক।
যদি তিনি জীবিত থাকেন, তাহলে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হোক।
সুইটির মা জহুরা বেগমের একটাই আবেদন—মেয়ের প্রকৃত অবস্থার বিষয়ে যেন পরিবারকে আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না হয়।