বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে না বলে বিএনপি যে অভিযোগ করছে, তা হাস্যকর। তাঁর দাবি, জামায়াতই জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণ করছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় রাজধানীতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট, সাংবিধানিক সংস্কার এবং বিরোধী দলের প্রতি সরকারের আচরণ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত বক্তব্য দেন গোলাম পরওয়ার।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরিবর্তে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিজেদের দলীয় লোক নিয়োগ দিচ্ছে।
তাঁর দাবি, জামায়াতসহ ১১টি দল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছে।
তিনি বলেন, বিএনপি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে না বলেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না এবং সংস্কারের প্রশ্নে নানা অজুহাত দেখাচ্ছে।
সরকারি কর্মকমিশনেও (পিএসসি) দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি দাবি করেন, পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের বিরুদ্ধেই ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। অথচ বর্তমান সরকার একই ধরনের কর্মকাণ্ড করছে বলে তাঁর অভিযোগ।
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁদের পরিবারের সহায়তার বিষয়েও কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় জামায়াতের আমির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরতে জামায়াত বাংলা, ইংরেজি ও আরবি—তিন ভাষায় বই প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে সরকারি তহবিল থাকা সত্ত্বেও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।
তাঁর দাবি, ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বেতনসংক্রান্ত সমস্যার কথাও তাঁদের কাছে এসেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, বিএনপি নিজেদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতের ওপর অনড় থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তাঁর অভিযোগ, সরকার সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের পথ বেছে নিচ্ছে।
গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধানের ক্ষমতাকাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে ভবিষ্যতেও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যাবে।
তিনি দাবি করেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট সংস্কারের পক্ষে পড়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা এই সংখ্যার স্বাধীন যাচাই এখানে করা হয়নি।
ওসমানী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেরও জবাব দেন গোলাম পরওয়ার।
তাঁর অভিযোগ, অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বিরোধীদলীয় নেতার নাম যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার বিষয়টি বিবেচনায় আমন্ত্রণপত্রে বিরোধীদলীয় নেতাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া উচিত ছিল।
এই কারণেই বিরোধীদলীয় নেতা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে অসত্য আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেই বিরোধী দলকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন ও দাবি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে।
তাঁর দাবি, সরকার বিরোধী দলের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছে।
সরকারের বর্তমান আচরণকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠিত কোনো আইনি সিদ্ধান্ত নয়।
অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোট করেনি।
তাঁর ভাষ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে একই আন্দোলনে অংশ নেওয়া হয়েছিল।
তবে সেটিকে রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের নির্বাচন পরিচালনার ভূমিকারও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।
বিশেষ করে সংসদ সদস্য আমীর হামজার ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি বাতিল এবং রাজশাহীতে একটি সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ করেন।
তাঁর দাবি, এসব ঘটনা বিরোধী মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করছে।
এ ছাড়া মাদরাসার ব্যবস্থাপনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি অভিযোগ করেন, এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগের উদ্দেশ্যেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।
পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর অনির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকারকে বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার।
একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন না করার আহ্বান জানান তিনি।