মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কৌশলগত অংশীদারত্বে কর্মীদের কল্যাণে নতুন উদ্যোগ আকিজ রিসোর্সের তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার সমাজকল্যাণমন্ত্রী শক্তি বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের, বুধবার অন্ধ্র উপকূলে আঘাতের শঙ্কা পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবকের বাড়িসহ তিন বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ২ অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি ২৯ অক্টোবর হচ্ছে না এইচএসসির ফল, নতুন তারিখ ৩১ অক্টোবর ৩৫০ বছর আগে বিলুপ্ত ডোডো পাখি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছেন বিজ্ঞানীরা! ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বাড়তি বেতন, তবে পাচ্ছেন না সবাই ভুয়া বিলের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকের মামলা ১৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে পীরগঞ্জে তিন হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, ২৫ পুকুরে গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

  • সবশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫৬ জন সংবাদটি দেখেছেন
এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক! ১৫০ মাছ পরীক্ষা করে যা পেলেন গবেষকেরা
এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক! ১৫০ মাছ পরীক্ষা করে যা পেলেন গবেষকেরা

নদী, সমুদ্র কিংবা ইলিশ মাছের পর এবার বাংলাদেশের চাষের পুকুরের মাছেও শনাক্ত হয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি মাছ চাষের পুকুরে পরিচালিত এক গবেষণায় পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের নমুনায় এসব কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সব পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে মোট ৯০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন গবেষকেরা।

এতে মাছ চাষের পরিবেশ, জলজ খাদ্যশৃঙ্খল এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গবেষণাটি চলতি অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Environmental Pollution-এ প্রকাশিত হয়েছে।

ময়মনসিংহের ২৫টি পুকুরে গবেষণা

এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক! ১৫০ মাছ পরীক্ষা করে যা পেলেন গবেষকেরা

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুর থেকে শীতকালে নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকেরা।

গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, ধরন, রাসায়নিক গঠন এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি নির্ণয় করা।

গবেষক বদিউজ্জামান খানের দাবি, বাংলাদেশের মিঠাপানির চাষের পুকুরের পলি ও মাছের নমুনা নিয়ে এ ধরনের সমন্বিত গবেষণা এটিই প্রথম।

পুকুরের পলিতে কত মাইক্রোপ্লাস্টিক?

গবেষণায় প্রতিটি পুকুরের তলদেশের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

দূষণের মাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত পলিউশন লোড ইনডেক্স বা দূষণভার সূচকের মান ছিল ১ থেকে ৪ দশমিক ৫।

এই সূচকের ভিত্তিতে অধিকাংশ নমুনা সংগ্রহস্থলে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার দূষণের ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা।

তাঁদের মতে, পুকুরে পানির প্রবাহ তুলনামূলক কম থাকায় প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা তলদেশে দীর্ঘ সময় জমে থাকতে পারে।

ফলে তলদেশে খাবার খোঁজা মাছ এসব কণার সংস্পর্শে আসতে পারে।

ছয় প্রজাতির ১৫০ মাছ পরীক্ষা

গবেষকেরা ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি চাষের মাছ পরীক্ষা করেন।

এসব মাছের নমুনায় মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পরীক্ষা করা মাছগুলোর ক্ষেত্রে গড় কণার সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক ৬০।

প্রজাতিভেদে কণার উপস্থিতিতে পার্থক্য দেখা গেছে।

গবেষণায় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • সরপুঁটি মাছে গড়ে ১ দশমিক ২০টি কণা
  • রুই ও মৃগেল মাছে গড়ে ০ দশমিক ৬৮টি কণা
  • কাতলা, কমন কার্প ও পাঙাশের নমুনায় তুলনামূলক কম কণা

তবে এই গড় সংখ্যা দিয়ে প্রতিটি মাছেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

তলদেশে বসবাসকারী মাছে বেশি কণা

গবেষণায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া মোট মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার ৫২ শতাংশ পাওয়া গেছে তলদেশে বসবাসকারী মাছের নমুনায়।

তলদেশ ও পানির মধ্যবর্তী স্তরে চলাচলকারী মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ।

অন্যদিকে পানির উপরিভাগের কাছাকাছি বসবাসকারী মাছের নমুনায় পাওয়া গেছে ১৩ শতাংশ কণা।

গবেষকেরা বলছেন, মাছের খাদ্য গ্রহণের ধরন ও বসবাসের স্তর মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক! ১৫০ মাছ পরীক্ষা করে যা পেলেন গবেষকেরা

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা।

পলিথিনের ব্যাগ, প্লাস্টিকের মোড়ক, বোতল, দড়ি, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য প্লাস্টিকসামগ্রী ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণা তৈরি হতে পারে।

এগুলো পানি ও মাটির সঙ্গে মিশে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষণায় প্রধানত পলিথিন বা পলিইথিলিন (PE) এবং পলিপ্রপিলিন (PP) ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

মাছের পুকুরে প্লাস্টিক আসছে কোথা থেকে?

গবেষকদের মতে, মাছের খাবার, খাবারের বস্তা ও মোড়ক, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পানি সরবরাহের পাইপ এবং আশপাশের গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুরে প্রবেশ করতে পারে।

এ ছাড়া বন্যার পানির মাধ্যমেও অন্য এলাকা থেকে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পুকুরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান জানিয়েছেন, মাছের পরিপাকতন্ত্রে মূলত মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

তবে সব মাছের খাবার দূষিত নয় এবং গবেষণায় পাওয়া কণাগুলোর নির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

কোন উৎস থেকে কতটা প্লাস্টিক পুকুরে প্রবেশ করছে, তা জানতে আরও নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন।

ত্রিশালে বছরে ৭২ হাজার টন মাছ উৎপাদন

ত্রিশাল উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার পুকুরে মাছ চাষ করা হয়।

এসব পুকুরে প্রতিবছর প্রায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়।

উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন জানিয়েছেন, পুকুরের পাশে পোলট্রি খামার থাকায় মাছ চাষের পরিবেশ দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ধরনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে একটি পুকুরের পাশ থেকে মুরগির খামার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছাতে পারে?

এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক! ১৫০ মাছ পরীক্ষা করে যা পেলেন গবেষকেরা

গবেষণার ফলাফল সামনে আসার পর চাষের মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের সহযোগী বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্যবিদ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের শরীরেও এসব কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

তাঁর মতে, মাছের মাধ্যমে এসব কণা মানুষের শরীরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিমুল হালদার জানিয়েছেন, সাধারণ রান্নার তাপে পলিথিন সহজে নষ্ট হয় না।

তিনি মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তবে মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া মানেই এসব মাছ খেলে মানুষের নির্দিষ্ট রোগ হবে—এমন প্রমাণ এই গবেষণা দেয়নি।

আরও গবেষণার তাগিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেছেন, মাছ চাষের পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও দূষণের মাত্রা, মাছের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাছ চাষের পুকুরে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা, ব্যবহৃত সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং পানি ও পলির নিয়মিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গবেষণাটি শুধু ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি পুকুরে পরিচালিত হয়েছে। ফলে এর ফলাফল দিয়ে বাংলাদেশের সব পুকুর কিংবা সব চাষের মাছের দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করা যাবে না।

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আরএনবি নিউজ ২০২৫-২৫
Theme Download From ThemesBazar.Com