ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম।
ফেসবুকে সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়ার একটি গ্রুপে এমনই একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। পোস্টদাতার দাবি, এটি ‘১০০% রিয়েল পোস্ট’। একই সঙ্গে কম টাকায় শিশু দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া ব্যক্তিদের ‘প্রতারক’ বলেও সতর্ক করা হয় সেখানে।
শুধু একটি পোস্ট নয়—ফেসবুকে ‘দত্তক’ দেওয়ার নামে শিশু হস্তান্তর ও অর্থের বিনিময়ে শিশু নেওয়ার এমন অসংখ্য প্রস্তাব ঘুরছে বিভিন্ন গ্রুপে। কোথাও নবজাতক, কোথাও কয়েক মাস বয়সী ছেলে বা মেয়েশিশুর জন্য সরাসরি দাম হাঁকা হচ্ছে। আবার সন্তান নিতে আগ্রহীরাও বয়স, লিঙ্গ এমনকি শিশুর চেহারা উল্লেখ করে চাহিদা জানাচ্ছেন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের আগেই গর্ভবতী নারীর সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত একটি অনুসন্ধানে ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এসব গ্রুপের বেশির ভাগের সদস্য কয়েক শ হলেও কোনো কোনোটিতে প্রায় ২০ হাজার সদস্য রয়েছে।
এর মধ্যে এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৪টি পোস্টে দত্তকের জন্য শিশু চাওয়া হয়েছে। বিপরীতে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়া গেছে ৬৩টি পোস্টে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেয়েশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুর জন্য বেশি অর্থ দাবি করার প্রবণতা রয়েছে।
একটি ফেসবুক গ্রুপের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা এক নারী দালাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের খুঁজে বের করা হয়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো নারী সন্তান দিয়ে দিতে রাজি হলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রসব পর্যন্ত তাঁর দেখাশোনা করে। এরপর ছেলে নবজাতকের জন্য প্রায় তিন লাখ এবং মেয়েশিশুর জন্য দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়। মধ্যস্থতাকারীরাও কমিশন পান।
তবে ওই নারীর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ফেসবুক গ্রুপগুলোর পোস্টে শিশু চাওয়া ও দেওয়ার ভাষাও অনেকটা পণ্য কেনাবেচার মতো।
কেউ লিখেছেন, তাঁর জরুরি ভিত্তিতে একটি ছেলেশিশু প্রয়োজন। কেউ নির্দিষ্ট করে জানিয়েছেন, অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে শিশু লাগবে। আবার একজন ৫০ হাজার টাকা ‘বাজেট’ উল্লেখ করে ১০ দিন থেকে এক মাস বয়সী ছেলেশিশু চেয়েছেন।
এক নারী পাঁচ থেকে ছয় মাসের গর্ভবতী কারও সঙ্গে চুক্তির আগ্রহ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তিনি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের খরচ বহন করে শিশুকে ইতালি নিয়ে যাবেন।
আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন থেকে চার মাস বয়সী মেয়েশিশু চেয়ে পোস্ট দিয়েছেন।
অন্যদিকে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া একটি পোস্টে পরিবারের আর্থিক ‘ডিমান্ড’ থাকার কথাও সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে।
ছয় মাস বয়সী একটি ছেলেশিশুকে দুই লাখ টাকায় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া পোস্টের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
পোস্টদাতা দাবি করেন, শিশুটির মায়ের অনুরোধে তিনি পোস্টটি দিয়েছেন এবং অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের সঙ্গে তাঁর নিজের কোনো স্বার্থ নেই।
তাঁর দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে এক নারী জানান, তিনি নরসিংদীতে থাকেন। শিশুটিকে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি এক লাখ টাকা চান।
টাকা চাওয়ার কারণ হিসেবে ওই নারী শিশুর জন্ম থেকে ছয় মাস পর্যন্ত লালন-পালন ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার খরচের কথা বলেন।
শিশুকে কেন দিতে চান—এমন প্রশ্নে তিনি পারিবারিক সমস্যার কথা জানান। তবে নিজের পূর্ণ পরিচয় ও ঠিকানা দেননি।
তিনি হোয়াটসঅ্যাপে একটি শিশুর ছবি ও টিকার কার্ডও পাঠান। ওই কার্ডে বাবার নাম ও ঠিকানার সঙ্গে কথোপকথনে পাওয়া তথ্যের অসামঞ্জস্য দেখা যায়।
এরপর মূল পোস্টদাতার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অন্য একজন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছেন, কিন্তু দুই লাখ টাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাঁর উদ্দেশ্য শিশুটির মাকে সাহায্য করা এবং অর্থের কোনো অংশ তিনি নেবেন না।

আরেকটি ফেসবুক পোস্টে এক ব্যক্তি নিজের দেড় থেকে দুই বছর বয়সী ছেলেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ‘দত্তক’ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
তাঁর দাবি ছিল, স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মোহরানার অর্থ পরিশোধ করতে শিশুটিকে দত্তক দিতে চান।
সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করা হলে ওই ব্যক্তি দাবি করেন, নিজের সন্তান নিজে দত্তক দিলে কোনো সমস্যা নেই।
শিশু পাওয়ার আশায় অর্থ দিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম জানান, তিনি তিনবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ একটি নবজাতকের বিষয়ে কথা হওয়ার পর এক নারী ভিডিও কলে শিশুকে দেখান এবং যাতায়াত খরচ হিসেবে অগ্রিম ১০ হাজার টাকা চান।
তাঁর দাবি, বিকাশে টাকা পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট ফেসবুক গ্রুপটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপসহ যোগাযোগের নম্বরগুলো থেকেও তাঁকে ব্লক করে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কোনো কোনো গ্রুপে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসা প্রতিবেদন চাওয়া হচ্ছে।
কিছু গ্রুপে শুক্রাণু দান ও সারোগেসি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো পোস্টে যৌনসেবার প্রস্তাবও পাওয়া গেছে।
এসব কর্মকাণ্ডের ফলে শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে তার পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে—এসব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ফেসবুকের বাইরেও অর্থের বিনিময়ে শিশু দত্তক বা অভিভাবকত্ব দেওয়ার মধ্যস্থতার কার্যক্রম পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।
গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলার একটি দেয়ালে ‘বাচ্চা দত্তক দিবেন? আমরা নিবো’ লেখা একটি নোটিশ পাওয়া যায়। সেখানে দুটি ফোন নম্বর ও একটি ঠিকানা ছিল।
সেই সূত্র ধরে ৩০ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেডের কার্যালয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ জানান, শিশু দেওয়া ও নেওয়ার জন্য তাঁদের নিজস্ব আবেদনপত্র রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি ‘কনসালটেন্সি সমন্বয়কারী’ হিসেবে কাজ করে।
তাদের ফরমে শিশু নিতে আগ্রহী পক্ষের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা সম্মানী নেওয়ার কথা লেখা থাকলেও কথোপকথনে ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়।
এর বাইরে শিশুদাতা পরিবারকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ এবং সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হলে সেই খরচ বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে ব্যয় প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটি দুই পক্ষকে একটি সম্মতিনামা ও সমঝোতা দলিল দেয়। সেখানে কোম্পানির পক্ষ থেকে দুজন সাক্ষীও স্বাক্ষর করেন।
তবে আবদুল আহাদ জানান, শিশু হস্তান্তরের পর আদালতের মাধ্যমে আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় থানা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে করণীয় জানতে চেয়েছিল, কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশনা পায়নি। ফলে তারা নিজেদের মতো করে কাগজপত্র সংরক্ষণ করছে।
তাঁর দাবি, অর্থের বিনিময়ে শিশু দত্তক দেওয়ার মধ্যস্থতা করে এমন আরও প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠানও সক্রিয়।
বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য সাধারণ বা সিভিল দত্তক আইন নেই। দেশে পারিবারিক আইন ধর্মভিত্তিক এবং মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই।
তবে ধর্মনির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তরের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সরকারিভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি ছোটমণি নিবাসে থাকা শিশুদের আদালতের মাধ্যমে আইনি অভিভাবকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে বেআইনি ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কোনো শিশুকে বিক্রি, কেনা বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক গ্রহণকে শোষণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের সাবেক মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিমের মতে, ‘শিশু দত্তক’, ‘নবজাতক প্রয়োজন’, ‘শিশু নিতে চাই’ কিংবা অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের মতো পোস্টকে সম্ভাব্য শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা অর্থের দর-কষাকষির পর সত্যিই শিশু হস্তান্তর হলে কারা অর্থ নিচ্ছেন, মধ্যস্থতাকারী বা সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না এবং শিশুকে পরবর্তী সময়ে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব তদন্ত করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদাও শিশু হস্তান্তরের পর তাদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে নজরদারির ঘাটতিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
তাঁর মতে, দেশের এতিম ও অসহায় শিশুদের দত্তক বা পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য একটি সর্বজনীন আইনি কাঠামো প্রয়োজন। কার্যকর নজরদারি থাকলে শিশু কেনাবেচা ঠেকানো সহজ হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, ফেসবুকে শিশু দত্তক দেওয়ার নামে প্রতারণার বিষয়টি তাঁদের জানা আছে। তবে এভাবে শিশু বিক্রির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তাঁরা পাননি।
তাঁর ভাষ্য, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ফেসবুকে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো অপরাধ। তবে দত্তকের নামে গ্রুপ খুলে শিশু বিক্রির তৎপরতার অভিযোগে এখন পর্যন্ত কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।
সন্তান নিতে আগ্রহী মানুষের চাহিদাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা এই অনিয়ন্ত্রিত বাজারে একদিকে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব, অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে শিশু পাওয়ার চাহিদা—দুটিই রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যস্থতাকারী, অর্থের দর-কষাকষি ও প্রতারণার অভিযোগ।
আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই এসব কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নজরদারি এবং দত্তক ও আইনি অভিভাবকত্বের জন্য সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।