বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
কৌশলগত অংশীদারত্বে কর্মীদের কল্যাণে নতুন উদ্যোগ আকিজ রিসোর্সের তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার সমাজকল্যাণমন্ত্রী শক্তি বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের, বুধবার অন্ধ্র উপকূলে আঘাতের শঙ্কা পীরগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবকের বাড়িসহ তিন বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ২ অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি ২৯ অক্টোবর হচ্ছে না এইচএসসির ফল, নতুন তারিখ ৩১ অক্টোবর ৩৫০ বছর আগে বিলুপ্ত ডোডো পাখি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনছেন বিজ্ঞানীরা! ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ বাড়তি বেতন, তবে পাচ্ছেন না সবাই ভুয়া বিলের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকের মামলা ১৪ জনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে পীরগঞ্জে তিন হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে সাড়ে ৮ হাজার নিয়োগ, পটিয়ারই ৫ হাজারের বেশি

  • সবশেষ আপডেট : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৬ জন সংবাদটি দেখেছেন

২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব নিয়োগের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহ করা হতো এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের (এস আলম) চট্টগ্রামের পটিয়ার বাড়ি ও আছদগঞ্জের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে রাখা বিশেষ বাক্সে।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ পান। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। শুধু এস আলমের নিজ উপজেলা পটিয়ার বাসিন্দা ছিলেন ৫ হাজার ১৪৮ জন। অর্থাৎ ওই সময়ে ব্যাংকটির মোট নিয়োগের প্রায় ৪৮ শতাংশই হয়েছে একটি উপজেলা থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজন বিবেচনার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থনির্ভরভাবে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়ায় ইসলামী ব্যাংকের বেতন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আঞ্চলিক মেরুকরণ ও কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগ্য ও মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরাও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৬ ধাপে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ

ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করতে কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং পরীক্ষা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরপরই নীতিমালায় ‘জরুরি মুহূর্তে’ বিশেষ শিথিলতার সুযোগ রেখে একটি ধারা যুক্ত করা হয়। পরে সেই সুযোগ ব্যবহার করে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৬টি ধাপে এভাবে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

এই প্রক্রিয়া শুধু প্রারম্ভিক পর্যায়ের পদে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টসহ (এসইভিপি) বিভিন্ন উচ্চপদেও একইভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পটিয়ার বাড়িতে রাখা হতো ‘সিভি বক্স’

তদন্তে ইসলামী ব্যাংকে জনবল নিয়োগের একটি বিশেষ পদ্ধতির তথ্যও উঠে এসেছে।

চাকরিপ্রার্থীদের সিভি সংগ্রহের জন্য এস আলমের পটিয়ার বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আছদগঞ্জের বাণিজ্যিক কার্যালয়ে বিশেষ বাক্স রাখা হতো।

এসব বাক্সে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল (সাতকানিয়া-লোহাগড়া)’, ‘মহিলা ক্যাশ’ ও ‘পিয়ন-ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন নাম লেখা থাকত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখান থেকে পছন্দের প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করে বাক্সবন্দী অবস্থায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। এরপর তাঁদের সরাসরি নিয়োগপত্র দেওয়া হতো।

এভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার কোনো মূল্যায়নপত্র ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ থেকে নামিয়ে ২০ শতাংশ

প্রবেশনারি অফিসার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের নিয়োগপ্রক্রিয়াকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ওই ব্যাচে নিয়োগের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করা ৭৮০ চাকরিপ্রার্থীর সিভি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ) পাঠানো হয়।

প্রাথমিক শর্ত ছিল, লিখিত পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। কিন্তু প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রার্থীদের সুবিধা দিতে পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়।

এরপর ৫৪০ জন মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন এবং তাঁদের মধ্যে ৩০৪ জন উত্তীর্ণ হন।

এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া আরও ১২ জনের সিভি সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁরা সবাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

সব মিলিয়ে ৩১৬ জনের মধ্যে প্রথম ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে এবং বাকি ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম।

এস আলমের নিয়ন্ত্রণের আগেও ছিল সরাসরি নিয়োগ

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেও ইসলামী ব্যাংকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া সরাসরি নিয়োগের নজির রয়েছে।

২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের নিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের ‘বিশেষ সুপারিশের’ ভিত্তিতে ১০ জনকে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিয়োগের পাশাপাশি চাকরিচ্যুতি নিয়েও প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। এরপর গঠিত নতুন পরিচালনা পর্ষদ ২০১৭ সালের পর নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মেধা ও যোগ্যতা পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ‘বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা’ নেওয়া হয়। এতে প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ৪০২ জন। অংশগ্রহণকারী সবাই উত্তীর্ণ হন এবং চাকরিতে বহাল থাকেন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে কর্মবিরতি পালন, অন্য কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের মাধ্যমে অসত্য তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না করেই তিন মাসের বেতন দিয়ে তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়।

একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৬১ জনকে বিশেষ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবসম্পদ বিভাগের এই প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগও উঠে এসেছে।

চাকরি ফেরতের দাবিতে আন্দোলন

গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের একটি অংশ পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। মঙ্গলবারও তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

তাঁদের নিয়োগ এবং পরবর্তী চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রতিবেদনেই ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগের এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ নেবে।

তবে নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত ইসলামী ব্যাংক নিজেই নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত।

এই খবরটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার দিন

এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আরএনবি নিউজ ২০২৫-২৫
Theme Download From ThemesBazar.Com