পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নূর আলম। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, পাঁচ বছরের সন্তান এবং শ্বশুরবাড়ির স্বজনেরা। কিন্তু জরুরি দাপ্তরিক কাজে শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে যান তিনি। পরদিন সকালে জানতে পারেন, রিসোর্টে আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী, সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য।
নিহত ছয়জন হলেন নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)।
নিহতদের মধ্যে নাফিসতা মীম (২৭) নামের আরও একজনের পরিচয় জানা গেছে। বাকি তিনজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নূর আলম বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত।
তাঁর গ্রামের বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়কোঠা ইউনিয়নের গাজিরপাড় এলাকায়। চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গায় বসবাস করছেন।
নূর আলম জানান, তাঁর স্ত্রী ফারিয়া কবির বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তারপরও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য সবাই মিলে কক্সবাজার ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন।
গত বুধবার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান তিনি। এরপর বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারে পৌঁছান।
তবে জরুরি দাপ্তরিক কাজ থাকায় শুক্রবার তাঁকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসতে হয়।
শনিবার সকালে গণমাধ্যমে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে শুরু করেন তিনি।
পরে জানতে পারেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ছয়জন রয়েছেন।
একসঙ্গে এতজন স্বজনকে হারানোর ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।

অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), ইসমাইল হোসেন মাসুদ (৩০), তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা (২৭), মান্নান (৩৪) ও সামিদা (৩২)।
হতাহতদের স্বজন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আহাদ জানিয়েছেন, আহত ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা-মামি।
তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের কাজ শুরু হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টের বিভিন্ন অংশ থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন শনিবার বেলা সোয়া দুইটার দিকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, রিসোর্টে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে দিনের শুরুতে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে পৌঁছায়।
হতাহতদের স্বজন মো. আহাদ জানান, শনিবার সকালে পর্যটক দলটির কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান পরিবারের একাধিক সদস্য।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই ঘটনায় এতজনের মৃত্যু মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।