যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতের মধ্যে ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ইঞ্জিন ও সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ইরানের পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে ৬৮ বছর বয়সী আখলাঘির নিয়োগ অনুমোদিত হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মনোনয়নের পক্ষে ভোট দেন ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা এবং বিপক্ষে ভোট দেন ১৫ জন।
মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি ইরানের সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে চার দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন তিনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আখলাঘির প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা ৪২ বছরের বেশি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে আখলাঘি ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন।
এসব প্রতিষ্ঠান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আখলাঘি এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায়ও তাঁর নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের তাসনিম সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে আখলাঘির ভূমিকা রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সেজিল ও জুলফিকার সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইয়াসিন গাইডেড বোমা।
এসব অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে ইরানি গণমাধ্যম।
এ ছাড়া সেমনানের ইমাম খোমেনি স্পেস সেন্টারে মহাকাশযান ও গবেষণা রকেটের অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করেছেন তিনি।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইরানের প্রতিরক্ষা নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ দেশটির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর মজিদ ইবনে-রেজা ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
আখলাঘি দায়িত্ব নেওয়ার পর মজিদ ইবনে-রেজা উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাজ করবেন বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় আখলাঘিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বক্তব্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়েছেন আখলাঘি।
ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় শক্তিশালী বোমা হামলার মার্কিন হুমকির প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানে নতুন করে হামলা হলে মার্কিন বাহিনীকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের সামরিক অভিযানে ইরানের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে তেহরান দাবি করছে, হামলার পরও তাদের উল্লেখযোগ্য আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে।
দুই পক্ষের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আখলাঘি সামরিক শিল্পের পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে—
১. সামরিক শিল্প ও অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।
২. আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
৩. ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন।
৪. সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি সংযোজন।
৫. সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।
আখলাঘি জানিয়েছেন, সামরিক প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে সামরিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা শিল্প অবকাঠামো পুনর্গঠন।
একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পার্লামেন্টে বলেছেন, ইরান কোনো দেশের বিরুদ্ধে প্রথমে আগ্রাসন চালাবে না। তবে আক্রমণের মুখে নিজেদের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
এমন পরিস্থিতিতে সামরিক প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আখলাঘির নিয়োগ ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।